ছোটগল্পঃ বেলিফুল
ছোটগল্পঃ বেলিফুল




 সারাদিনের খাটুনি শেষে ঘরে ফিরে অন্ধকার রুমের ২৫ ওয়াটের বাতিটা জ্বালাতেই চোখ ঝাঁঝিয়ে উঠলো। খুব ক্লান্ত লাগছে। ভালো করে একটা গোসল দিতে পারলে আরাম লাগতো। ওয়াশরুমে গিয়ে নিশ্চয়ই দেখবো পানি নেই। বাসাটায় পানির খুব সমস্যা। একটা ড্রাম কিনেছিলাম পানি রাখার জন্য। কিন্তু সুবিধে হলো না তাতে। বাড়িওয়ালা দুবেলা পানি ছাড়ে। সকালে আর সন্ধ্যায়। সকালে থাকে আমার অফিসের তাড়াহুড়ো আর ফিরতে ফিরতে হয় রাত। পানি রাখার সুযোগ নেই৷ 

আমি থাকি পূর্ব নাখালপাড়ায়।  ছয় তালা বাসা।  চিলেকোঠার মতো একটা সিংগেল রুম। ভাড়া বেশি না৷ মাত্র তিনহাজার টাকা। রুম থেকে বের হলেই ছাদ। ছাদে কোন গাছপালা নেই। বাড়িওয়ালা ভদ্রলোক মরুভূমির দেশে কুড়ি বছর কাটিয়ে এসেছেন৷ বোধ হয় সবুজ পছন্দ না উনার। এতো বড় একটা ছাদের কোথাও একটুকরো ক্যাকটাসও নেই। শুধু মরা গাছের কয়েকটা টব পড়ে আছে এখানে সেখানে। বাসাটায় দিনের বেলা থাকে ভ্যাপসা গরম। শেষরাতের দিকে একটু ঠান্ডা নামে। শহরের ফাঁকফোকড় পেড়িয়ে জানালা গলিয়ে আসা হালকা বাতাসে গা জুড়িয়ে যায়৷ ঘুমটা জোড়ালো হয়ে চেপে বসে তখন৷ বাড়িওয়ালার সবুজ পছন্দ না হলেও আমার সবুজ পছন্দ৷ দরজার সামনে টবে করে একটা বেলীফুলের গাছ লাগিয়েছি। কয়েকটা কলি হয়েছে তবে এখনো ফুল ফুটেনি। পাতাগুলো কেমন হলুদ হয়ে যাচ্ছে। স্পষ্টতই অযত্নের ছাপ।

বেলিফুলের কথা বলতেই রাত্রির কথা মনে পড়ে গেলো৷ বেলিফুল ছিলো রাত্রির প্রিয় ফুল। যতোবার ওর সাথে ঘুরতে বের হয়েছি ওকে বেলিফুলের মালা কিনে দিয়েছি। ১০ টাকার সামান্য একটা মালা পেয়েই মেয়েটা কেমন বাচ্চাদের মতো আহ্লাদী হয়ে উঠতো! খুশিতে চোখ ঝলমল করতো! বড্ড মায়া হতো আমার। মালাটা বারবার নাকের কাছে নিয়ে চোখ বন্ধ করে ঘ্রান নিতো বারবার। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম।  ৩ বছরের এই সম্পর্কে ওকে ভালো কিছু গিফট করতে পারিনি। বেকার ছিলাম তখন।  টাকা পয়সা ছিলো না।

 টিউশানির টাকা দিয়ে চলতে নিজেরই হিমশিম খেতে হতো। মাঝেমধ্যে গ্রামেও টাকা পাঠানো লাগতো৷ গ্রামে থাকে টুনি আর আম্মা। টুনি আমার ছোট বোন৷ ক্লাস নাইনে পড়ে। বেজায় চঞ্চল। আমার কাছে ওর আবদারের যেনো শেষ নেই। ভাইয়া এই পাঠাও ওই পাঠাও করে মাথা খারাপ করে দেয়। আম্মা টুনিকে ধমক দেয়। টুনির মন খারাপ হয়৷ অভিমানে গাল ফোলে উঠে। চোখ বেয়ে দুফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে। আমার ও পকেট ফুরিয়ে যায়৷ টুনিকে কিছু দেয়া হয় না আর। 

রাত্রির জন্মদিন নিয়ে একটা ঘটনা বলি৷
একবার এমন হলো যে ওর জন্মদিনের কিছুদিন আগে থেকে আমার সব টাকা পয়সা শেষ৷ হাতে কানাকড়িও নেই। কপালে চিন্তার ভাজ। বাসা থেকেও টাকা আনার উপায় নেই। কি করি? কোনকিছু ভেবে না পেয়ে ফাল্গুনীর  থেকে ২০০ টাকা ধার নিলাম। হাকিম চত্ত্বরের সামনে থেকে একগোছা কাচের চুড়ি আর একটা বেলিফুলের মালা নিয়ে রমনা পার্কে হাজির হলাম। 


সামান্য উপহারটুকো পেয়ে রাত্রি খুশিতে কেদে ফেললো৷ মেয়েটা খুব কাদতে পারতো। অকারনেই কেদে বুক ভাসিয়ে দিতো। আমি আলতো করে রাত্রির চোখের পানি মুছে দিলাম। বিকেলের হিমেল হাওয়ায় ওর সামনের চুলগুলো আমার চোখে মুখে এসে বাড়ি খেতে লাগলো৷গা থেকে আসতে লাগলো মিষ্টি একটা সেন্টের গন্ধ। রাত্রি মাথা এলিয়ে দিলো আমার ঘাড়ে। আমি মাথা ঘুরাতেই ওর ঠোঁটগুলো আমার নাগালে চলে আসলো। ঠোটের কমনীয় ভাজগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। যেনো কমলার হৃষ্টপুষ্ট কোয়ার বুকে শ্বেত শুভ্র শিরাগুলো আঁকিবুঁকির কেটে আছে৷ রাত্রির ঠোঁট কাপছে। যেনো ইশারায় কিছু চাইছে। আমি আলতো করে চুমু খেলাম। একফালি উষ্ণ নিশ্বাস আমাকে আরো অবাধ্য হতে সাহস দিলো। মনে মনে ভাবলাম এটাকেই বোধ হয় সুখ বলে। 
কাজল দিলে রাত্রিকে লাগে হেমা মালিনীর মতো। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি রাত্রির চোখের দিকে৷ এ দেখার যেনো কোন শেষ নেই। যেনো আমি বেচেই আছি ঐ দুইজোড়া চোখের মায়ায়৷  
- হাবলার মতো তাকিয়ে আছো কেনো? 
- এমনিই। তোমাকে দেখছি৷ 
-  ঢং! গা জ্বলে যাচ্ছে দেখে৷ 
- ভালোবাসার বৃষ্টি হয়ে ভিজিয়ে দেবো? 
- না গো।  লাগবে না।  আপাততো আমাকে বিয়ে করার ব্যবস্থা করো। তাহলে সারাজীবনই দেখতে পারবে।
-  চলো পালিয়ে বিয়ে করে ফেলি। তারপর চড়ুই পাখির মতো একটা ছোট্ট সংসার পাতবো।
- আজব!  তুমি কি চোর নাকি যে পালিয়ে বিয়ে করবে? আমার বাসায় প্রস্তাব পাঠাও। 
- হুম। একটা চাকুরী হলেই ঝামেলা চুকে যাবে৷ সি.ভি পাঠিয়েছি আরো কয়েকটা জায়গায়। দেখি কি হয়৷ 
রাত্রি চুপ করে রইলো৷ দৃষ্টি উদাসীন। আমরা হাত ধরে পাশাপাশি বসে রইলাম৷ শীতকালীন অলস বৈকালের কুয়াশা আমাদের ক্রমেই ঢেকে ফেলছে। 
- একটা কথা জিজ্ঞাসা করি রাহাত?
 রাত্রি নিরবতা ভাঙলো। 
- করো 
- যখন তুমি আমাকে রোজকার জন্য পেয়ে যাবে আমার প্রতি তোমার এই আকর্ষণ হারিয়ে যাবে না তো? 
- ছি! এসব কি বলছো? তোমার ভালোবাসার মোহ কি আমি কখনো কাটাতে পারবো পাগলী? 
- জানিনা সত্যিই পারবে কিনা৷ ধরো রোজ রোজ আমার শরীরের গন্ধ পেতে পেতে তুমি অভ্যস্ত হয়ে গেছো কিংবা আমার বিশেষত্ব গুলো ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যেতে লাগলো তোমার কাছে। তখন?  
- হা হা হা।  শোনো, ভালোবাসা কখনো ক্ষীণ হয় না। হয়তো রূপ পাল্টায় কিন্তু আবেগ একই থাকে। 
- হয়তো৷ 
রাত্রি আর কিছু বললো না৷ আগের মতোই হাত ধরে বসে রইলো। মনে হলো হাতটা যেনো আগের চেয়ে শক্ত করে চেপে ধরেছে৷ 


কিছুদিন আগে রাত্রির বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ছেলে দেশের য়বাহিরে থাকে।  ভালো বেতনের চাকুরী করে। বিয়ের পর রাত্রিকেও নিয়ে যাবে । হয়তো এতোদিনে নিয়েও গিয়েছে।  আমি কষ্ট পাইনি। মেনে নিয়েছি।  আমার মতো মধ্যবিত্ত  মানুষগুলোকে অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। ওর বিয়ের দিন আমার একটা ইন্টারভিউ ছিলো। বুক ভরা হাহাকার নিয়ে ইন্টারভিউ দিতে গেলাম। চাকরিটা হয়েও গেলো। শুধু থেকে গেলো একটা বোবা আফসোস। 

এখন রাত ১১ টা। পানি আসে নি এখনো। খাটে নিথর হয়ে শুয়ে আছি। সিলিং এ সাদা ফ্যানটা ঘটঘট করে ঘুরছে। ময়লা জমে জমে ছাই রঙ হয়ে গেছে পাখাগুলোর। ক্লান্তিতে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। তন্দ্রা নেমে এসেছে চোখে । নাকের কাছে খুব পরিচিত একটা গন্ধ পাচ্ছি। বেলিফুলের গন্ধ?  কপালে কারো স্পর্শ টের পাচ্ছি। কে যেনো মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলছে,আমাকে মালা কিনে দিবে রাহাত ? একটা বেলীফুলের মালা? 



© রুদ্র মেহেরাব 



3 Comments

Post a Comment

Previous Post Next Post