|| অপেক্ষা ||
সাদিয়া খান তিলামণি
![]() |
| অণুগল্পঃ আজন্ম অপেক্ষা |
🍁🍁
আর মাত্র একটা ফাঁসির অপেক্ষা...
জল্লাদ শাহজাহান(কয়েদী নাম্বার ১১৫):তারপর মুক্তি!
৩০ বছর থেকে কমে ২৫ বছর হলো।সময়ের চাকা না ঘুরে ভাগ্যের চাকা ঘুরলো।সবার জীবনের সময় কেড়ে নিতে নিতে আমার সাজার সময় কখন কমে গেছে টের পায় নি!
আমার মেয়েটার বয়স এখন ২৫ হয়েছে।শুনেছি,সে নাকি ওকালতি পড়েছে।নিশ্চয়ই,ও আমার হয়ে ওকালতি করে সময় কমিয়েছে।আজ বড়ই শান্তি লাগছে।
তো আপনার কোনো ছেলে মেয়ে নাই? প্রবীর ভাই?
প্রবীর(কয়েদী নাম্বার ১৯৯):
(দীর্ঘশ্বাস ফেলে)আছে..একটাই মেয়ে আমার,আপনার মতো।জানিনা..তাকে আর দেখতে পাবো কি না!
জল্লাদ শাহজাহান: কেন?আপনি না বললেন,কিছুদিনের মধ্যেই আপনার শেষ শুনানি।তো আপনার স্ত্রী আর মেয়ে আসবে না?
প্রবীর: হুম।আসবে তো।যেদিন থেকে এই চৌদ্দ শিকের মধ্যে বন্দী হয়েছি,নিঃশ্বাসের ভরসা নেই বলে টের পেয়েছি।তাই বললাম আর কি...
(১২ দিন পর)
অন্যসব কয়েদীর থেকে প্রবীর সুশিক্ষিত।আর জল্লাদ শাহজাহান নামাযী।তার কোরআন পাঠের সুমধুর ধ্বনিতেই আমাদের ঘুম ভাঙে।কাল তাদের দুইজনেরই মুক্তির দিন।দুইজনের মধ্যে অল্প কয়েকদিনে খুব ভালো সম্পর্ক হলেও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কারো কিছু জানা নেই।
আমি শেষ বারের মতো আজ রাতে তাদের তদারকি করতে গেলাম।Jailor হওয়ার সুবাদে প্রত্যেক কয়েদি সম্পর্কেই বিস্তারিত জানি আমি।Duty শেষে আমার desk এ বসে এই দুইজনের গল্প মনে পরে গেল আমার..
প্রবীর পেশায় সাধারণ কেরানি ছিল।Previous criminal record ও নেই তার।তবে অফিসের মালিক ও তার পরিবারকে খুনের অভিযোগে সাজা পায় সে।
প্রবীরের একমাত্র মেয়েটা ক্যান্সারে আক্রান্ত।
মেয়েটা মরে যাওয়ার আগে বাবাকে একবার দেখার অপেক্ষা করছে...
ঐদিকে জল্লাদ শাহজাহানের মেয়ে বাবার অপরাধকে ঘৃণা করে,প্রত্যেক অপরাধীকে সাজা দেওয়ার জেদ ধরে,আজ সুনামধন্য ব্যারিস্টার।শাহজাহান জানে না তার প্রতি তার মেয়ের এই ঘৃণার কথা।শুনেছি,অন্ধ আইনের বিচারে,অন্যের অপরাধের সাজা ভোগ করছে শাহজাহান।আগামীকাল ৩৬ তম ফাঁসিটা দিলেই,গর্বিত বাবা হিসেবে তার ব্যারিস্টার মেয়েকে দুচোখ ভরে দেখার অপেক্ষা করছে...
অতঃপর ভোর ৪.১০ এ জল্লাদ শাহজাহান তার শেষ ফাঁসিটি দেওয়ার অপেক্ষা করছে।শাহজাহান আজ যার ফাঁসি দিতে যাচ্ছে,তার কথা মাথায় আনতে চাইছে না।শুধু নিজেকে বলছে,”এটি আমার মুক্তির ফাঁসি..”
আমি বললাম,কয়েদি নাম্বার ১৯৯ উপস্থিত।
কথাটি শোনার পর প্রথমবারের মতো জল্লাদ শাহজাহানের হাত কাঁপছে।গত ৩৫ টা ফাঁসি কার্যকরে তার চোখ ভিজে নি।আজকে শাহজানের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পরা দেখার অপেক্ষা শেষ হলো আমার।
ফাঁসির মঞ্চে প্রবীর প্রস্তুত।শাহজাহান বোধহয় তার মুক্তির ফাঁসিটা দিতে পারবেনা..
এমন সময়ে শেষ কথাটি প্রবীর বললো,
“শাহজাহান,আমাকে সন্তান হারানোর কষ্ট থেকে মুক্ত করো,ভাই।”
অতঃপর ভোর ৪.১০,ফাঁসি কার্যকর।
শাহজাহান তার দৈত্যদেহ নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরলো।সবশেষে,শাহজাহান বাইরে বেরিয়ে দেখলো,তাকে সাজামুক্ত অবস্থায় দেখতে কেউ আসেনি...
একদিকে,মুক্তিতে অপেক্ষার অবসান ঘটেনি..
অন্যদিকে,মেয়ের কবরের পাশে বাবার কবর সব অপেক্ষার
ইতি টানলো..
© লেখক স্বত্বঃ সাদিয়া খান তিলামণি
📚 প্রকাশন কার্টেসিঃ রু দ্র ন

Post a Comment