|| অধরা আহূত ||

তাসনীম যারীন নিজর্না

🍁

ক্লাসে বসে আছি। জানালা দিয়ে হাওয়া এসে বইয়ের উপর লাগছিলো। আর সেই হাওয়ায় বইয়ের পৃষ্ঠা গুলো একের পর এক উদ্দেশ্যহীন ভাবে উলোট-পালোট খাচ্ছিলো। আমি অপলক দৃষ্টিতে বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছি। ক্লাসে স্যার সমাস পড়াচ্ছিলেন। কিন্তু আমার সেইদিকে মন নেই। কি  যেন ভাবছিলাম। হয়তো কিছুই না! হঠাৎ ছুটির ঘন্টা বেজে উঠলো। ৪ টা বেজে গেছে? কখন যে সময় চলে গেলো বুঝতেই পারলাম না। একে একে সবাই ক্লাস থেকে বেরিয়ে পড়লাম।



শিশুতোষঃ অধরা আহূত [তাসনীম যারীন নিজর্না]
শিশুতোষঃ অধরা আহূত [তাসনীম যারীন নিজর্না]


আমি তখন সপ্তম শ্রেনীতে পড়ি। ক্লাস শেষ হওয়ায় যে যার বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করলাম। আমাদের বাসা স্কুল থেকে বেশি দূরে নয়। এই রাস্তাটা আমি সাধারণত একা একা ই যাই। বাসায় গিয়ে গোসল করে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম থেকে উঠে মাগরিবের নামাজ শেষে পড়তে বসলাম। এমন সময় ছোট বোন আদর এসে সারাদিনের জমিয়ে রাখা সব গল্প আমার কাছে বলতে শুরু করলো। আম্মু ওকে জোর করে বেশি সব্জি খাওয়ায়। আব্বু ওর জন্য আজ ওর প্রিয় চকলেট আনে নি। আরও কত কি! আমি চুপ করে ওর নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছি আর মাথা নাড়াচ্ছি। আদর আমাকে সব কিছু বলে। সারাদিনের সব গল্প সন্ধ্যায় আমাকে না বললে ওর ঘুম ই হয় না। ঐদিনও যথারীতি সারাদিনের সব গল্প বলছিলো। হঠাৎ করে সে অভিযোগের সুরে বলে উঠলো,জানো ভাইয়া,আমাদের মুরগীটা দশটা ডিম পারছে। কিন্তু আম্মু আমাকে একটা ও খেতে দিচ্ছে না। আমি ওকে প্রশ্ন করলাম, কেন? ও বললো এইগুলা রেখে দিয়েছে মুরগির ছানা ফোটাবে বলে। আমি ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম,দেখো আমাদের মাত্র একটা মুরগি। এখন দশটা ডিম থেকে যদি ছানা হয় আমাদের এগারোটা মুরগি হবে। এইগুলি বড় হলে আবার ডিম দিবে। তখন অনেক গুলি ডিম আর তুমি ইচ্ছেমত খেতে পারবে। তখন আদর খুশি হয়ে উঠে দাঁড়ালো আর বললো, ভাইয়া আমি তো এটা ভেবেই দেখি নি! 

এই বলে সে দৌড় দিয়ে পাশের রুমে যেয়ে আম্মুকে বললো যে সে আর তার উপর অভিমান করে নেই।

খন্ডগল্পঃ ময়নাতদন্তের ইতিবৃত্ত 


রাতে সবাই একসাথে খেয়ে আমি আমার রুমে শুয়ে পড়লাম। আর আদর,আব্বু,আম্মু পাশের রুমে শুয়ে পড়লো। সকালে নাস্তা করে স্কুলের জন্য তৈরি হয়ে বাসা থেকে বের হচ্ছিলাম, এমন সময় বারান্দায় তাকিয়ে দেখি আমাদের মুরগীটা ডিমে তা দিচ্ছে।কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে চলে গেলাম। স্কুলে গিয়ে দুতলায় উঠে ক্লাসে গিয়ে দেখি কিসের যেন একটা হট্টগোল। সবাই গোল হয়ে কি যেন আলোচনা করছে। আর আমাদের ক্লাস মনিটর সুমন কি যেন লিখছে খাতায়। কাছে গিয়ে বুঝতে পারলাম ফুটবল টুর্নামেন্ট হবে। ক্লাস সেভেন বনাম ক্লাস নাইন। যারা যারা খেলতে উৎসাহী ক্লাস মনিটর তাদের নাম লিখছে। লিখে আমাদের শ্রেনী শিক্ষক জনাব হান্নান স্যারকে দিবে। উনি বিকেলে উৎসাহীদের থেকে বাছাই করে নিবে। আমি নাম দিতে চাই নি।সুমন নিজ থেকেই আমার নাম দিয়ে দিলো।


ছোটগল্পঃ এক জোড়া ক্লান্ত পা 


বিকেলে আমাদের মধ্যে থেকে স্যার বাছাই করলেন।আমাকেও খেলার জন্য নির্বাচন করলেন। দুইদিন বাদে খেলা অনুষ্ঠিত হবে আমাদের মাঠে। এ কয়দিন  প্রচুর প্র‍্যাক্টিস করলাম। অতঃপর খেলার দিন আসলো।ক্লাস নাইন বনাম ক্লাস সেভেন। আমরা সবাই লাল রং এর জার্সি পড়লাম।আর ক্লাস নাইন নীল রং এর।খেলা শুরু হলো।দশ মিনিট পর অপরপক্ষের খেলোয়ার একটা গোল দিল।তারপর আরও ১০ মিনিট চলে গেল কেউ গোল দিতে পারলো না।সুমন একটা গোল মিস করল।এদিকে খেলার সময় ও শেষ হয়ে যাচ্ছে।চাপ বাড়তে লাগলো আমাদের দলের উপর।শেষ পর্যন্ত আমি একটা গোল দিতে সক্ষম হলাম।আর মাত্র পাঁচ মিনিট সময় বাকি আছে।এখন যে দলই গোল দিবে সে দলই বিজয়ী।আমি বল নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি এমন সময় অপর দলের একজন খেলোয়ারের পায়ের সাথে লেগে আমি পড়ে গেলাম।প্রচন্ড ব্যাথায় আমি কাতরাতে শুরু করলাম।স্যার দৌড়ে আসলেন আমার কাছে।এরপর আর কিছু মনে নেই।


আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম।যখন জ্ঞান ফিরলো চোখ মেলে দেখি আমি বাসায়।পাশে মা কান্না করছে।পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি পা প্লাস্টার করা।বুঝতে আর বাকি রইল না যে,পায়ের একটা হাড় ভেংগে গেসে।ডাক্তার একমাস হাটাচলা করতে বারণ করেছেন।তারপর আর কি!বিছানায় শুয়ে শুয়ে দিন কাটাতে লাগলাম।বিছানায় শুয়ে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।তাকিয়ে থাকতে থাকতে আকাশের বিশালতায় হারিয়ে যেতাম।

যেনো মিশে যেতাম নীল আকাশের বিশালতায়। 


এভাবেই দিন অতিবাহিত হতে লাগলো আমার।আদর দিনে অনেকবার এসে আমার সাথে গল্প করে যায়।মা এসে খাবার আর ঔষধ খাইয়ে যায়।আমার পাশে বসে আমার মাথায় হাত বুলায়ে বলে,সব ঠিক হয়ে যাবে।মন খারাপ করিস না। কিন্তু আম্মুর নিজের ঠিকই মন খারাপ হয় আমার জন্য। আম্মু আমার সামনে হাসি মুখে কথা বললে ও মনে মনে খুবই দু:খ পাচ্ছে। মায়েরা এমন ই হয়। সন্তানের বিপদে সব থেকে বেশি দু:খ পায় আবার সব দু:খ কে আড়াল করে সন্তানের মনে সাহস জোগাতে ঠিক ই ভুলে না।একদিন আমি বিছানায় শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।আদর এসে কাঁদো কাঁদো চেহারায় বললো, ভাইয়া আমাদের মুরগিটা মারা গেসে।আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,কি বলো!কিভাবে?

ও বললো,এমনি হঠাৎ করে মারা গেলো।আমি জিজ্ঞেস করলাম ডিম গুলো থেকে কি ছানা হইছিলো?ও বললো, "না"।আমারও মনটা খারাপ হয়ে গেলো।তারপর আম্মু কৃত্রিম উপায়ে আলো দিয়ে ফিম ফোটাতে চেয়েছিলো।কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত একটা বাদে বাকি সবগুলি ডিম ই নষ্ট হয়ে যায় অত্যধিক তাপমাত্রার কারণে।শুধুমাত্র একটা ডিম ফুটে ছানা বেরিয়েছিলো।


ছোটগল্পঃ অন্তর জানে


আদর ছানাটাকে দেখানোর জন্য আমার রুমে নিয়ে এসেছে।আদর আমার কাছে আসার সাথে সাথেই ছানাটা আামার হাতের উপর পরে যায়।মনে হলো যেন অনেক দিনের পরিচয়  আমাদের!হলুদরঙের ছানাটা। আমি ছানাটাকে আমার গালের সাথে আলতোভাবে লাগাতেই ছানাটা ঠোঁট দিয়ে আমার গালে ঠোকর দেয়।আমার মায়া পরে যায় ছানাটার উপর। আদর আার আমি মিলে আমার বিছানার পাশের টেবিলের উপর ছানাটার জন্য একটা ছোট  বাসা করলাম।তারপর থেকে ছানাটা আর আমি এক রুমেই ছিলাম। আমি বিছানায় বসেই ছানাটাকে খাবার দিতাম,পানি দিতাম। একদিন সকালে ঘুমিয়ে আছি হঠাৎ হাতের উপর কিসের একটা   উপস্থিতি অনুভব করলাম।ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখি ছানাটা আমার হাতের উপর হাঁটছে।আমি ছানাটাকে আমার কাছে নিয়ে আদর করলাম।সারাদিন ছানাটার সাথে খেলা করেই আমার দিন কেটে যেত। ছানাটাকে আমি আার আাদর শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করিয়ে দিতাম। সারাদিন ছানাটার সাথে সময় কাটাতাম আদর করতাম। ছানাটা ও খুব মজা পেতো।সারাদিন আমার সাথেই থাকত। কিভাবে যে একমাস কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না।একমাস পর বাবা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল প্লাস্টার খোলার জন্য। ডাক্তার বললেন  পা ঠিক হয়ে গিয়েছে। এখন হাঁটতে পারব।তবে কিছুদিন সাবধানে  হাঁটতে হবে। বাসায় যাওয়ার সময় বাবাকে বললাম একটু দোকানে যাব।বাবা বুঝে গিয়েছে   যে আমি ছানার জন্যই কিছু কিনতে যাব। বাবা হাসি দিয়ে বললো আচ্ছা। দোকান থেকে ছানার জন্য খাবার কিনলাম।কিনে বাসায় যেতে না যেতেই আদর এসে  আমায় জড়িয়ে কাঁদতে শুরু করল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কি হয়েছে?আম্মু কি কিছু বলেছে?"

Fund For Healthcare Around The World 

কান্নার কারনে ওর কথা কিছু বুঝতে পারছিলাম না।শুধু শুনতে পেলাম ছানাটা...শুনেই আমি আঁতকে উঠলাম।কি ছানাটা?!কি হয়েছে ছানার??ছানাটা ঠিক আছে তো? তখন আম্মু বল্লো আদর ছানাটাকে নিয়ে বাসার বাইরে খেলা করতে গিয়েছে আর তখনই ছানাটাকে কাকে নিয়ে গিয়েছে।কথাটা শুনে আমি দাঁড়ান থেকে বসে পড়লাম। তখনও ছানাটার জন্য যে খাবার কিনেছিলাম তার প্যাকেটগুলো আমার হাতে । আদর আমাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছে।কি করবো বুঝতে পারছিলাম না।আমি শুধু ছানাটার ঘরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।মনে হচ্ছিল এখনই ছানাটা আমার হাতের উপর উঠবে।আর আমি ছানাটাকে আমার গালের কাছে রেখে আদর করবো! এসব ভাবতে  ছানার বাসাটা ঝাপসা হয়ে আসছিল ক্রমশ। দেখতে পারছি না বাসাটা আর।সব ঝাপসা হয়ে গেছে তবু্ও  অপলকভাবে তাকিয়ে ছিলাম বাসাটার দিকে!


©লেখক স্বত্বঃ তাসনীম যারীন নিজর্না 

📚প্রকাশন কার্টেসিঃ রু দ্র ণ 

7 Comments

Post a Comment

Previous Post Next Post