||অন্তর জানে ||
রুদ্র মেহেরাব
![]() |
| ©রু দ্র ন |
🍁
বড় মেয়েটাকে নিয়ে রমিজ মিয়া বিপদে পড়ে গেলেন। ঘরে চাল বাড়ন্ত। পকেটের অবস্থা ও শোচনীয়। ধার দেনা করে মাসের শেষটা চালাচ্ছেন কোন রকমে৷ করম আলীর কাছ থেকে সুদে টাকা এনেছিলেন মাস তিনেক আগে৷ সুদে আসলে হিসেবটা নিশ্চয় ফুলেফেঁপে উঠেছে এতোদিনে ! রমিজ মিয়া সহজে করম আলীর রুমখানার সামনে দিয়ে যাতায়াত করেন না৷ নেহাত দরকার না পড়লে ওমুখোই হোন না। আর গেলেও চলাচল শেয়ালের মতো সন্তপর্ণে। কিন্তু কথায় আছে যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়৷ রমিজ মিয়াও বাঘের কাছে ধরা খান অবশেষে৷ সেদিন ক্যাশিয়ার মকবুলের কাছে কি যেনো একটা কাজে যাবার পথে সহসা করম আলীর কাছে ধরা খেলেন রমিজ মিয়া।
- কি ব্যাপার মিয়ার ব্যাটা? তুমি দেখি আজকাল চোর পুলিশ খেলতাছো আমার সাথে? ঘটনা কি?
- কোন ঘটনা নাই ভাইজান
কাচুমাচু গলায় উত্তর দেয় রমিজ মিয়া। এভাবে দুম করে করম আলীর সামনে পড়ে যাবে সেটা ধাতস্থ করতে সময় লাগছে তার৷
- তুমিই কইলেই তো হইবো না! টাকা দেওনের ভয়ে যে তুমি পলাপলি খেলতাছো, সেইটা কি আমি বুঝিনা ভাবছো?
- ভাইজান আর কয়টা দিন সময় দেন
- নেও যতোদিন ইচ্ছা সময় নেও! পাঁচ টাকার সুদ যদি তুমি পাঁচশ টাকা দিতে পারো তাইলে আমার তো কোন সমস্যা নাই৷ খালি সময় মতো আমার সুদখান দিয়া দিলেই চলবো।
করম আলী মেহেদি দেয়া দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে অফিস রুমে ঢুকে যায়৷ রুমে ঢুকতে ঢুকতে বিদ্রুপের ভঙ্গিতে রমিজ মিয়ার দিকে মুখ ফিরিয়ে মেঝেতে একদলা পান খাওয়া থুথু ফেলে। ছাই রঙের ফ্লোরে লাল টকটকা থুথু অলস দলা পাকিয়ে পড়ে থাকে৷ করম আলী দেখতে এমন আল্লাহ ওয়াল মানুষ হলেও তলে তলে ঠিকই সুদ খায়। দেখে অনেকের বিশ্বাস হতে চাইবে না৷
রমিজ মিয়া ভয় পায়৷ কলজে শুকিয়া যাবার মতো ভয় পায়। এতো টাকা সে কোত্থেকে দেবে? তার ছ'মাসের বেতন একসাথে করলেও তো সুদ মেটানো সম্ভব না! তার মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। মস্তিষ্ক কিয়ৎক্ষণের জন্য বোধ শক্তিহীন হয়ে পড়ে৷ করিডরের ঐ মাথা থেকে বড় সাহেবের হাঁক শোনা যায় - রমিজ? ঐ রমিজ?
রমিজ মিয়ার বড় মেয়ে টগর। তিন মাস ধরে বাপের বাড়িতে পড়ে আছে। শ্বশুর বাড়িতে যাবার কোন নাম গন্ধ নেই৷ মেয়ের শ্বাশুড়ির এসে নিয়ে যাবার কথা থাকলেও অমুক দিন আসবো তমুক দিন আসবো করে করে তিন মাস কাটিয়ে দিলেন তারা। রমিজ মিয়া বিপদ বুঝতে পারে৷ বাবা হয়ে মেয়েকে তো আর নিজে থেকে শ্বশুর বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া যায় না৷ পাছে না আবার কথা উঠে মেয়েকে খাওয়াতে পড়াতে পারেনা বলে পাঠিয়ে দিয়েছে৷ ক'টাদিন নাইওর ও থাকতে দিলোনা৷ কেমন বাপ রে বাপু! ছেঃ! ছেঃ! রমিজ মিয়া পড়ে গেলেন বিপদে৷ একা মানুষ বড় একটা সংসার টানছেন৷ আরো দু'দুটো ছেলে মেয়েকে পড়াশোনা করাচ্ছেন৷ তাদের খরচ - সংসারের খরচ রমিজ মিয়া যেনো আর কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। বাড়তি একটা মুখও এ সংসারে এখন গোদের উপর বিষ ফোঁড়া। এরমধ্যে একদিন টগরের শাশুড়ী রমিজ মিয়াকে টেলিফোন করে জানায় বিয়ের সময় যে এক লক্ষ টাকা যৌতুক দেবার কথা ছিলো তা না দিলে মেয়েকে তারা ফিরিয়ে আনবে না৷ প্রয়োজনে তাদের ছেলেকে অন্য জায়গায় বিয়ে করাবে। রমিজ মিয়ার এতোদিনের পুষে রাখা আশংকা বাস্তবে এসে ধরা দেয় এবার৷ তার মাথায় দিনে দুপুরে বজ্রাঘাত পড়ে।
সারা শরীর অবশ হয়ে আসে, দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও হারিয়ে যায়। টেলিফোন হাতে রমিজ মিয়া ধপাস করে ফ্লোরে বসে পড়ে। তার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হয় না যেনো কণ্ঠনালী অবরুদ্ধ হয়ে আছে।
খন্ডগল্পঃ ময়নাতদন্তের ইতিবৃত্ত
টগরের বিয়ে হয়েছে দুই বছর আগে। ছেলে মেডিকেল রিপ্রেসেন্টেটিভ। জাত বংশ খুব একটা ভালো না। রমিজ মিয়া বিয়ের এই প্রস্তাবে রাজী ছিলেন না। তাছাড়া মেয়ের মায়ের ও মত ছিলনা। অফিসের বড় কর্তা হারুন সাহেব অনেকটা জোরজবরদস্তি করে তাদেরকে রাজি করিয়েছে৷ হাজার হোক অফিসের বড় সাহেবের কথা তো আর ফেলে দেয়া যায় না! তাছাড়া সংসারে খরুচে একটা মুখও যদি কমে সেটাওবা মন্দ কিসের? কাঁধের বোঝা কিছুটা হলেও তো হালকা হবে! মেয়ে বড় হয়েছে, বিয়ে তো দিতে হবেই৷ আল্লাহপাক তার দানাপানি যেখানে লিখে রেখেছেন সেখানেই তার বিয়ে হবে। এখানে রমিজ মিয়ারই বা বিশেষ হাত কোথায়? মনে মনে নিজের দূর্বলতা ঢাকার চেষ্টা করে রমিজ মিয়া। শুধু জোরাজোরিতে যে বিয়ের মতো এতো বড় একটা সামাজিক সম্বন্ধ গড়ে উঠে না রমিজ মিয়ার মন সেটা জানে।
________
|| দুই ||
ব্রাদার্স গ্রুপের দশ তলা বিল্ডিংয়ের ছোট একটা কামড়ায় রমিজ মিয়ার অফিস রুম। এখানেই তিনি ছোটখাটো একটা কেরানির চাকুরি করে কাটিয়ে দিলেন জীবনের দীর্ঘ কুড়িটি বছর। জাম কাঠের পলিশ করা শক্ত সেই চেয়ার, একই টেবিল - ঠিক কুড়ি বছর আগে যেমনটা ছিলো, আজো তেমনটাই আছে। আশ্চর্য ব্যাপার এই কুড়ি বছরে একবারের জন্যও কি রুমের চেয়ার টেবিল বদলানো হয় নি? রমিজ নিয়া মনে করতে পারেনা৷ তার চোখে সব কিছু আগের মতোই ধরা দেয়৷ দেয়াল ঘেঁষে শেলফ ভর্তি বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকা ধূলোজমা মলিন নথিপত্র। এসব বয়োবৃদ্ধ নথি-পত্রগুলো থেকে কর্পুরের গন্ধের মতো একপ্রকার নেশা ধরিয়ে দেয়া গন্ধ রমিজ মিয়ার নাকের ডগায় এসে রোজ বাড়ি খেয়ে যায় যেনো নিজেদের কঙ্কালসার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে রুমের কর্তাকে। রমিজ মিয়া চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার গ্রিলে হাত রেখে উপরের দিকে তাকায়। সূর্য ঢলে পড়তে শুরু করেছে পশ্চিম আকাশে। আকাশের স্থানে স্থানে গুমোট মেঘ এসে জমছে আর বুক ফাটিয়ে গুড়ুম গুড়ুম শব্দে অজানা ক্রোধ ঝেড়ে দিচ্ছে। সারাদিনের ক্লান্ত সূর্যকে হার মানিয়ে চারদিক অন্ধকার করে ছুটে আসছে দলছুট মেঘেদের দল। এখনি ঝুপ করে বৃষ্টি নামবে। মেঘেদের দিকে তাকিয়ে রমিজ মিয়ার প্রথম জীবনের কথা মনে পড়ে গেলো। এমনই এক মেঘ গুড়গুড় দিনে মাথা ভর্তি রাজ্যের অনিশ্চয়তা নিয়ে সোনা দাদুর দেয়া হলুদ খামের চিঠিখানা হাতে নিয়ে তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন ব্রাদার্স গ্রুপের মালিক নেয়াজ সাহেবের কাছে। নেয়াজ সাহেব সোনা দাদুর বাল্যবন্ধু। সোনা দাদু বাল্যবন্ধুকে চিঠিতে লিখে দিলেন যে করেই হোক এই অসহয় যুবকটিকে যেনো তার কোম্পানিতে চাকুরির ব্যবস্থা করে দেয়া হয়৷ নেয়াজ সাহেবও বাল্যবন্ধুর কথা ফেললেন না৷ রমিজ মিয়াকে সাথে সাথে দুই হাজার টাকা মাইনের কেরানীর চাকুরিতে নিযুক্ত করলেন৷ বড্ড ভালো লোক ছিলেন সোনা দাদু। তা না হলে কেউ রাস্তার এক খেলনা ফেরিওয়ালার জন্য এতো কিছু করে? অথচ রমিজ মিয়া না ছিলো তার জ্ঞাতিগুষ্টির, না ছিলো কোন অতি পরিচিত কেউ। রমিজ মিয়ার মনে পড়ে যায় সেদিনের কথা, সোনা দাদুর দোতলা বাড়িটার সামনে রাস্তার ধারে বসে মাথায় হাত দিয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদছিল সে। ঘরে অভুক্ত স্ত্রী, কোলে তার চার মাসের বাচ্চা, দুদিন ধরে না খেয়ে আছে সবাই। মেয়েটাকে যে বুকের দুধ খাওয়াবে সেটারও কোন জো নেই। খেলনা ফেরী করে দু'দুটো প্রাণীর অন্নসংস্থান করতে না পারার ব্যার্থতায় খোলা আকাশের নিচে রমিজ মিয়া সেদিন প্রাণ ভরে কাঁদছিলো। সোনা দাদু এ দৃশ্য দেখে বেলকনি থেকে নিচে নেমে এলেন৷ মনোযোগ দিয়ে ফেরিওয়ালার সব কথা শুনলেন।
- পড়াশুনা কিছু করেছো?
- জ্বি স্যার
- গুড৷ কতোটুকু পর্যন্ত পড়েছো?
- মেট্রিক সেকেন্ড ডিভিশন৷ টাকার অভাবে কলেজে ভর্তি হতে পারি নাই৷
- চাকুরির বাকরির কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে?
- জ্বি না স্যার৷ কোথাও চাকুরি পাই নাই৷ নিরুপায় হয়ে ফেরি করতে নেমেছি৷
- No worries. Come with me
সোনা দাদু রমিজ মিয়াকে বাড়িতে নিয়ে এসে পেট ভরে খাওয়ালেন৷ অভুক্ত রমিজা মিয়াকে দেখে দাদুর বড্ড মায়া হলো৷ তিনি ডাইনিং টেবিলে বসে ক্ষুধার্ত রমিজ মিয়ার গোগ্রাসে প্লেট সাবাড় করার দৃশ্য দেখতে লাগলেন যেনো লুভর মিউজিয়ামের জগদ্বিখ্যাত কোন এক শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে শিল্প নির্যাস নিচ্ছেন। খাওয়া শেষ হলে দাদু রমিজ মিয়ার স্ত্রী বাচ্চার জন্য হাজার খানেক টাকা আর একটা হলুদ খামের চিঠি ধরিয়ে দিলেন৷
- এই টাকা দিয়ে বাচ্চার জন্য দুধ কিনবে, ঘরের জন্য বাজার সদাই করবে।
রমিজ মিয়া নিতে চাচ্ছিলো না৷ কারোর থেকে সাহায্য নিতে তার ভালো লাগে না৷ সোনা দাদু জোর করে দিলেন৷
- শুনো, ভেবে নাও টাকাটা আমি তোমাকে ধারে দিচ্ছি। আর এই চিঠিটা নিয়ে সোজা ব্রাদার্স গ্রুপের মালিকের কাছে চলে যাবা। আজকেই যাবা৷ আমি টেলিফোনে তোমার কথা বলে রাখবো।
সেই থেকে রমিজ মিয়ার জীবনের একটা অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্রাদার্স গ্রুপ। এর মধ্যে কোম্পানির কতো উত্থান পতন হয়েছে, কতো কর্মী ছাঁটাই হয়েছে কিন্তু রমিজ মিয়ার চেয়ার কেউ কেড়ে নিতে আসেনি৷ ব্রাদার্স গ্রুপের মতো সোনা দাদুও অবশ্য রমিজ মিয়ার জীবনেরই একটা অংশ হয়ে উঠেছিলো। রমিজ মিয়া রোজ এসে সোনা দাদুকে দেখে যেতো। একা মানুষ, দুটো চাকর আর বৃদ্ধ মালিটা ছাড়া বাড়িতে আর কেউ নেই। ছেলে মেয়ে দেশের বাহিরে সেটেল্ড। বছরে এক-আধবার দেশে আসে। তাও দিন পনেরোর বেশি থাকতে পারেনা৷ এ দিকে দাদুরও বয়স হয়েছে,যেকোন সময় চলে আসবে ওপারে যাবার ডাক। এরমধ্যে দাদু ভীষণ রকমের অসুস্থ হয়ে পড়লেন। দিন দিন তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে শুরু করলে রমিজ মিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন সোনা দাদুকে দেখভাল করার জন্য এখন থেকে তিনি সস্ত্রীক এ বাড়িতেই থাকবেন। সোনা দাদুও শুনে খুশি হলেন। কিন্তু উভয়ের এই সুখ বেশি দিন স্থায়ী হলো না। এক শীতের সকালে সোনা দাদু অকস্মাৎ স্ট্রোক করলেন৷ তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হলো। ডাক্তার সাহেব ইসিজির ছন্দ হীন সরলরেখাটার দিকে তাকিয়ে রোবটের স্বরে বললেন, সরি উনাকে বাঁচানো গেলো না।
আমেরিকা থেকে তার ছেলে মেয়ারা আসবে বলে সোনা দাদুকে হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হলো দুদিন৷ দু'দিন পর জানা গেলো ছেলে মেয়েরা কেউ আসতে পারবে না৷ তাদের বাবাকে যেনো ঠিকঠাক দাফন কাফন করা হয়। যত খরচাপাতির লাগে তা তারা পাঠিয়ে দিবে৷ রমিজ মিয়া সোনা দাদুর ছেলে মেয়েদের কান্ডকারখানা দেখে মুষড়ে পড়লেন৷ দাদুর জন্য তার আফসোস হতে লাগলো। সোনা দাদুর মৃত্যুর পর রমিজ মিয়া দাদুর স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আগের মতো ঐ বাড়িতেই থাকতে লাগলেন৷ কিন্তু মাস ঘুরতে না ঘুরতেই নতুন বিপত্তির উদয় হলো৷ আমেরিকা থেকে দাদুর ছেলে উকিলকে দিয়ে চিঠি পাঠালেন যে এই বাড়ি তারা ডেভলপার কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দিয়েছে৷ অগত্যা রমিজ মিয়াকে এতোদিনের সোনালি স্মৃতি পিছনে রেখে সোনা দাদুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হলো। তার বার বার মনে হচ্ছিলো দাদুর সেই প্রথমদিনের ধার দেয়া হাজার টাকাটা আর ফেরত দেয়া হলো না৷
_____
|| তিন ||
- টগরের টাকার কোন ব্যবস্থা হইলো?
- না
- দুই বছর হয়ে গেলো এখনো টাকাটা দেয়া হলো না৷ মেয়েরে কয়দিন এখানে রাখবেন?
- কি করমু টগরের মা? এই আকালের দিনে এতো টাকা কই পাবো বলতো?
- আমি বলি কি,গ্রামের বাড়িটা বিক্রি করে দেন৷ টগরের যৌতুকের টাকাও যোগাড় হবে আবার ধার দেনাও শোধ করা যাবে।
- কি বলতেছো টগরের মা! ঐ বাপের ভিটাখান ছাড়া আমার আর কিছু আছে? সেইটাও যদি বেচে দিই তাহলে বুড়া বয়সে মাথা গুজবো কোথায় গিয়ে?
- সেটা আল্লাহপাক কপালে যা রাখছেন তা ই হবে৷ শোনেন, ভিটার মায়া কইরেন না৷ টগরের যৌতুকের টাকা, মানুষের ধার দেনা, শিউলি আর সাগরের পড়ালেখার খরচ - সব কিছু একটু ভাবেন৷
রমিজ মিয়া ভাবতে বসে ভাবনার সাগরে হারিয়ে যায়৷ কিন্তু কোন কূল কিনারা করতে পারে না৷ একসময় হতাশ হয়ে একফালি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভেতরের চাপা আর্তনাদটা লঘু করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে বউয়ের দিকে তাকান,
- আচ্ছা টগরের মা, একটা কাজ করলে কেমন হয়?
- কি কাজ?
- শিউলিরে এক ইয়ার ড্রপ দিতে বলবা? তাহলে একজনের পড়ার খরচটা কমলো কিছু।
- মেয়ের সামনে মেট্রিক পরীক্ষা! এই সময় তারে ড্রপ দেওয়াবেন? কি বলতেছেন এগুলা?
- সমস্যা কি? পরীক্ষা সামনের বছর দিবে! ফেইল করলে মানুষ পরের বছর পরীক্ষা দেয় না!
- জানিনা৷ আপনে যা ভালো বুঝেন করেন৷ আমারে কিছু জিজ্ঞাসা করতে আইসেন না৷
বুদ্ধিটা বউয়ের পছন্দ না হলেও রমিজ মিয়ার ঠিক ভালো লেগে যায়৷ তিনি মনস্থির করেন যে সামনের শুক্রবার গ্রামে গিয়ে ভিটেখান বিক্রি করে আসবেন৷ ঐ ভিটার উপর আগে থেকেই গুলশান মেম্বারের কুনজর ছিলো। ভালো টাকা দিয়ে কিনে নেবার আশ্বাসও দিয়েছিলো কিন্তু রমিজ মিয়া শেষ সম্বল বাপের ভিটেটা হাত ছাড়া করতে চাচ্ছিলেন না৷
কিন্তু এখন তিনি নিরুপায়৷
রাতে খাওয়া শেষ করে রমিজ মিয়া শিউলির সাথে কথা বলতে গেলেন৷ সাগর আর শিউলি পাশাপাশি দুটো টেবিলে মাথা ঢুলে ঢুলে পড়ছে তখন।
- শিউলি আম্মাজান
- বাবা বলো
- তোমার সাথে কথা আছে । একটু আমার রুমে আসো।
- আসতেসি বাবা৷
সাগর অভিমানী গলায় বলে উঠলো, বাবা তুমি শিলুর জন্য আবার কিছু কিনে নিয়ে আসছো? তুমি খালি তোমার মেয়েদেরই আদর করো! তোমার যে একটা ছেলে আছে সেটা তুমি ভূলেই যাও!
- ধূর পাগল! তুই হইলি আমার একমাত্র ছেলে, তোরে কি আমি কম আদর করি?
শিউলি সাগরকে আরেকটু উসকিয়ে দিয়ে বলে, সাগু,তোকে বাবা ড্রেন থেকে কুড়ায়া আনছে! জানিস না তুই?
ছেলে অসহায় ভঙিতে বাবার দিকে তাকালে বাবা আশ্বস্ত করে, দেখিস না মানুষ বলে তুই অবিকল আমার মতো হয়েছিস? কুড়ায়া আনলে তাইলে কেমনে হয়? বোকা কোথাকার।
শিউলি বাবার রুমে আসলে রমিজ মিয়া তাকে বসতে বলে৷
- আম্মাজান, তোমার মেট্রিক পরিক্ষার আর কতদিন বাকি?
- বেশিদিন না বাবা৷ সামনের মাসে টেস্ট, তার দু-তিন মাস পরই বোর্ড পরীক্ষা
- আম্মাজান তুমি এই বছর পরীক্ষা দিও না।
কথাটা শুনে শিউলি যেনো আকাশ থেকে পড়লো। বাবার মুখ থেকে কথাটা বের হয়েছে সেটা যেনো তার কর্ণ যুগল বিশ্বাস করতে চাইছে না৷ শিউলি বিস্মিত চেহারায় বাবার দিকে তাকায়
- বাবা কি বলতেছো তুমি! কেনো পরীক্ষা দিবো না!
- আম্মাজান, আমাদের হাল হকিকত তো দেখতেছো, আমি যে আর পারতেছি না মা! তুমি এক বছরের জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দাও আম্মাজান৷ এই একটা বছর তোমার বাবার জন্য স্যাকরিফাইস করতেছো ভাইব্যা নিজেরে স্বান্তনা দিয়ো মা!
এইটুকুন বলে রমিজ মিয়া নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। তার গলা ধরে আসলো। চোখের জমিন জুড়ে নেমে আসলো ছলছল শ্রাবণের ধারা। শিউলি মুখ ফুটে কিছু বললো না। নিজেকে স্বান্তনা দেবার মতো ভাষা তার জানা নেই। সে শুধু এটুকুই জানে আগামী একটি বছর তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ৷ চোখ মুছতে মুছতে সে নিজের রুমে চলে যায়৷ পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে টগরের মা ও নিঃশব্দে অশ্রুবিসর্জন উৎসবে শামিল হয়।
পরের শুক্রবার রমিজ মিয়া গ্রামে যায়৷ গুলশান মেম্বারের কাছে আত্মসমর্পণ করে শেষ সম্বল ভিটে বাড়িটা বিক্রি করে দেয়।
- মিয়ার ব্যাটা, জল তো খাইলা কিন্তুক ঘোলা কইর্যা খাইলা। গতবছর যদি দিয়া দিতা তাইলে কিছু টাকা না হয় বাড়ায়ে দিতাম। এই বছর ব্যবসা বানিজ্যের অবস্থা ভালা না৷ বেশি দিতে পারুম না৷
রমিজ মিয়া কিছু বলে না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে৷ তার চোখের সামনে ভাসতে থাকে জলজ্যান্ত শৈশব। জাম গাছটার মগডাল থেকে শালিকের বাচ্চা চুরি করে নিয়ে আসা, বর্ষাকালে কচুরি পানার ছোট ছোট বর্শি পেতে মাছ ধরা, দাওয়ায় বসে মায়ের হাতের ভাজা পুটি মাছ আর পোড়া মরিচ দিয়ে মাখানো মোটা লাল চালের ভাত, যেনো এখনো তরতাজা দেখতে পাচ্ছেন নিজের চোখে৷ গুলশান মেম্বার রমিজ মিয়ার হাতে টাকার পুটলিটা দিয়ে বললো,
- একটা কথা জিগামু মিয়ার ব্যাটা?
- জিগান
- কিছু মনে করবা না তো?
- মনে করার মতো না হইলে মনে করমু কেন?
- লোক মুখে শুনেছি তোমার বড় মাইয়্যা টগর হেয় নাকি তোমার আপনা মাইয়্যা না? তারে নাকি রাস্তা থিকা কুড়াইয়া পাইয়া নিজের মাইয়্যার লাহান বড় কইরা বিবাহ দিছো। ঘটনা কি সত্য?
রমিজ মিয়া কিছুক্ষন গুলশান মেম্বারের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে নির্লিপ্ত স্বরে উত্তর দেয়, না, সত্য না। টগর আমার আপনা মাইয়্যা।
সে রাতে প্রবল বৃষ্টি নামে৷ শেষ বাসটা মিস হওয়ায় রমিজ মিয়া সিদ্ধান্ত নেয় আজকে রাতটা শেষবারের মতো বাপের ভিটায় কাটিয়ে সকাল সকাল ঢাকা ফিরবে। দোকান থেকে রুটি কলা খেয়ে রমিজ মিয়া ঘরের ভাঙা চৌকিটায় শুতে যায়৷ তখনো বাহিরে প্রবল বর্ষন চলছে। অন্ধকার ঘরে রমিজ মিয়ার মস্তিষ্কে গুলশান মেম্বারের প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে থাকে। তবে কি গ্রামে জানাজানি হয়েছে ব্যাপারটা? হোক। রমিজ মিয়া ধার ধারেনা সেটার। পনের বছর আগে কোল জুড়ে নিজেদের প্রথম সন্তান শিউলি আসা স্বত্তেও রমিজ মিয়া আর তার স্ত্রী যেভাবে মনে মনে কসম কেটেছিলো,টগরকে তারা কখনো অসহায় হতে দিবে না, ঠিক একই ভাবে রমিজ মিয়া আজকেও কসম কাটে। ভাঙা চালার ফুটো বেয়ে আসা বৃষ্টির জলের সাথে রমিজ মিয়ার চোখের জল মিশে যেতে চায় পরম আদরে।
_______

Post a Comment