রুম নাম্বার টু সিক্সটিন

- শাকিব শাহরিয়ার প্রিয়   

___

হররঃ রুম নাম্বার টু সিক্সটিন
হররঃ রুম নাম্বার টু সিক্সটিন 


।।এক।।


অত্যন্ত গোছাল স্বভাবের মানুষ সজল।সবকিছু নির্ভুলভাবে করে এবং করতে চায়।কোথাও উনিশ বিশ হলে সে ঘাবড়ে যায়।
জীবনের প্রতিটা দিন সে যত্ন করে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রাখে।নিয়মের বাইরে কোন কাজ করে না।সপ্তাহের সাতদিনের কোন দিন কী রঙের টাই পরবে সেটা নির্দিষ্ট করা আছে;প্রতিদিন সকাল ঠিক সোয়া সাতটায় একই নাস্তা করে সে।
একা মানুষ;বিয়ে থা করে নি।তার ধারণা স্ত্রী-সন্তানের ঝামেলায় জড়ালে জীবনের সব নিয়ম একে একে ভেঙে পড়বে।সজল পেশায় একজন ভ্রাম্যমান সেলসম্যান।ছোট ছোট বুকশপে ঘুরে ঘুরে নিজের লেখা ‘হাউ টু অরগানাইজ ইওর লাইফ’ বইটা বিক্রি করে।এই ভিনদেশে এসে এই কাজটা করতে তাকে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না।মাঝে মাঝে ভাবে,দেশে থাকলে এই কাজ করতে তার কি হালই না হত!আজকাল বাসে বাসে ঘুরে যে লোকগুলো বই বেচে,তাদের দুঃখ দুর্দশার তো শেষই নেই,মানুষজন বই কেনাও ছেড়ে দিছে প্রায়!তাও আবার নিজের লেখা বই নিজে বিক্রি করবে,এ তো ভাবাই যায় না,কেউ কিনবে তো আদৌ!কিন্তু এই ভিনদেশে এটাও চলে,এটাই তো ওদের আমাদের পার্থক্য!!!
নিপাট ভদ্রলোক সজল।সবসময় শোভন জীবনযাপন করতে অভ্যস্ত;এজন্য কাজের তাগিদে যখন ভিন্ন-ভিন্ন শহরে বিভিন্ন হোটেলে রাত্রিযাপন করতে হয়,সে অসুবিধায় পড়ে যায়।কারণ সেই পরিবেশটা অজানা,অচেনা।
সজল নিজেই এই সমস্যার সমাধান বের করেছে।যেখানেই যায় ‘লাইক-হোম হোটেল চেইন’-এ সবসময় থাকার চেষ্টা করে।সেখানে সে বাড়ির পরিবেশ পায়।একইরকম সবুজ বার সাবান,সাদা তোয়ালে,দেয়ালে ঝোলানো বুলফাইটারের ছবি…সত্যিই জীবনটা সে খুব ভালোভাবে গুছিয়ে নিয়েছে।
অবশ্য বিপদ কখনও বলে-কয়ে আসে না।ব্যবসার জন্য ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ সে একদিন অপ্রত্যাশিত বিপদের মুখে পড়ল।‘মেইন’ শহরটা সম্পর্কে তার বিশেষ ভালোভাবে জানা ছিল না;শুনেছিল শহরের উত্তর দিকে একটা বুকস্টোর আছে,যেখানে বড়সড় মেইল অর্ডার বিজনেস হয়।লোকেশনটা প্রত্যন্ত এলাকায় হওয়া সত্ত্বেও মনে হয়েছিল মার্কেটটা বেশ ভালো।দোকানটা খুজে পেতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেলেও তার ব্যবসায়িক আলাপটা বেশ লাভজনক হয়েছিল;এক বসাতেই এক হাজার বই বিক্রি করতে পেরেছে।
ফিরে যাওয়ার সময় সে একটা ক্যাফেতে থামল;আজকের সাফল্যটা একটু উদযাপন করা দরকার।
ক্যাফের কোনার একটা টেবিলে ধূমায়িত কফি নিয়ে বসে জানালার বাইরে মৃদু তুষারপাত উপভোগ করছিল।তখনই রেডিওতে ভেসে আসা আবহাওয়ার পূর্বাভাস ওর সমস্ত চিন্তা-চেতনাকে ওলট পালট করে দিল।সন্ধ্যায় ভারী তুষারঝড়ের আশংকা করে ট্রাভেলারদের সতর্ক করা হচ্ছে।
হঠাৎ করে আতঙ্কে সজলের বুকে যেন ব্যথা করে উঠল।এমন হল কী করে আজ! সকালেও তো সব ঠিকই ছিল! যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সজল মূল শহরে ফিরে যেতে মনস্থ করল,যেখানে গিয়ে লাইক-হোম হোটেলে রাত কাটাতে পারবে।
গাড়ির মোটর গরম করার সময় চেক করে নিল, ‘মেইন’ শহরের রাস্তার মানচিত্রটা জায়গামত আছে কি না।মূল শহরে ফিরে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো রুট হল কান্ট্রিসাইডের পাশ ধরে যে টু-লেইন হাইওয়ে গেছে,সেখান দিয়ে যেতে হবে।গাড়ি সামনে বাড়ানোর জন্য মনস্থির করল,তুষারপাতের অবস্থা খারাপ হওয়ার আগেই তিনঘন্টার ভেতরে ট্রিপটা শেষ করতে হবে।
__


।।দুই।।


ছোট্ট শহরটা থেকে বেরিয়ে মাত্র বিশ মাইল পেরোনোর পরেই এমন তুষারপাত শুরু হলো,গাড়ির উইণ্ডশিল্ডের উপরে মনে হচ্ছে কোনও মোটা কম্বল দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। কালো রাস্তা ধূসর হয়ে গেছে,পাশের খোলা বিস্তীর্ণ মাঠ থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না।
সজলের একবার মনে হলো আর সামনে না এগিয়ে ফিরে যাবে;কিন্তু পরক্ষণেই শহুরে আরাম-আয়েশ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে লাগল।আর ফিরে যাওয়া হলো না।
প্রবল তুষার ঝড় সূর্যের আলো শুষে নেয়ায় চারদিকে কেমন যেন ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।হেডলাইটের আলো তুষারে প্রতিফলিত হয়ে এসে সজলের দৃষ্টি ঝাপসা করে দিচ্ছে।জানালার কাচের বাইরে নিকষ অন্ধকার।সহজাত প্রবৃত্তির বশে রাস্তা ঠাউরে নিতে হচ্ছে;গাড়ির চাকা একবার কংক্রিট থেকে রুক্ষ জমিনে,আবার পরমুহূর্তেই জমিন থেকে রাস্তায় পিছলে যাচ্ছে।
কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম জমেছে;মাথার পিছনে ঘাড় বেয়ে নামছে।মনের হাজারও দুশ্চিন্তার সঙ্গে যুদ্ধ করে সামনে এগোতে হচ্ছে;সামনে কী হবে?
এটা কি হলো! মনে হচ্ছে জীবনে এবার মিরাকলই ঘটলো।
ভীষণ তুষার ঝড়ের মধ্যেও দূরে একটা লাল নিয়ন সাইন জ্বলজ্বল করছেঃ ‘রাইট ইন’ (RIGHT INN)।
প্রথম দেখায় সজল ভেবেছিল ওটা একটা দিক নির্দেশনার সাইন;পরক্ষণেই ভাল করে লক্ষ করে বুঝতে পারল দ্বিতীয় শব্দ ‘ইন’ শব্দের অর্থ হলো মোটেল, ঠিক এই মুহূর্তে যা ওর খুব প্রয়োজন।
একটা লাল তীরচিহ্ন ডানদিকে মোড় নেয়ার জন্য নির্দেশ করছে।সজল ব্রেক কষে কয়েক ফিট পিছিয়ে এসে,ডানে মোড় নিয়ে দুইসারি ঘন পাতাবাহারের ঝোপের ভিতর দিয়ে গাড়ি ছোটাল।বরফে ঢাকা রাস্তায় ড্রাইভওয়ে খুজে পাওয়ার আর কোনও উপায় নেই।
খাড়া,উচু ঢাল বেয়ে ওঠার সময় গাড়ির চাকা বারবার পাক খেয়ে ঘুরে যাচ্ছিল।কষ্টসাধ্য হলেও অবশেষে সজল ওটাকে উপরে চুড়ো পর্যন্ত চালিয়ে নিয়ে পারল।চোখের সামনে একটা বড় গ্রে-স্টোনের বিল্ডিং।পার্কিং লটে গাড়ি রেখে ,ব্যাকসিট থেকে ওভারনাইট কেসটা বের করে গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিল।
রাইট ইনের বিল্ডিংটা দেখতে বেশ অদ্ভুত।তুষারঝড়ের মধ্যেও সজল দেখতে পেল অন্যান্য হোটেলের মত এখানে কোনও নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই।সত্যি বলতে কী বিল্ডিংটার চেহারা মোটেই হোটেলের মত নয়।ওটাকে পুরনো পরিত্যক্ত অট্টালিকার মত দেখাচ্ছে।
আবহাওয়া পরিস্থিতি অন্যরকম হলে সজল মোটেও এখানে থাকত না।প্রয়োজনে হাজার মাইল গাড়ি চালিয়ে হলেও অন্য কোনও মোটেল খুজে বের করত।কিন্তু আজ সে নিয়তির হাতে বন্দি।
ভাগ্যকে মেনে নিয়ে ধীরে ধীরে ইনের কাঠের ভারী দরজার সামনে গিয়ে দাড়ালো;লোহার হ্যান্ডেলটা ধরে খোলার জন্য ভিতরে ধাক্কা দিল।
ভিতরে ঢোকার পর গাঢ় অন্ধকারাচ্ছন্ন লবিতে প্রায় কিছুই স্পষ্ট করে দেখতে পেল না।ভারী দরজাটা তার পিছনে নিজে-নিজেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার শব্দটা সজলের মনে কু ডেকে গেল!!!
এত বড় ঘরটায় কোনও বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা নেই।চারটা দেয়ালেই মোমদানিতে মোমবাতি জ্বলছে;উচু জানালাগুলো ভারী,মোটা পর্দা দিয়ে ঢাকা,জরাজীর্ণ ফায়ারপ্লেসে পটপট শব্দে পুড়ছে কাঠ।
ক্ষীণ আলো চোখে সয়ে আসার পর সজল আবারও চারপাশে ভাল করে নজর বোলাল।সে কি ভুল করে কারও ব্যক্তিগত বাড়িতে ঢুকে পড়েছে?রাইট ইনে যেতে হলে বোধহয় আরেকটু এগোতে হবে;সে একটু আগেই গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে।
সজল যখনই মনস্থির করল গাড়িতে ফিরে যাবে,তখনই দেখল সামনের লাল ভেলভেটের চাদরে ঢাকা লম্বা টেবিলটার এক কোনায় একটি ছোট পিতলের বেল রাখা আছে।তার পাশে একটা বড় খাতা,যার উপরে লেখা …‘গেস্টস’।
সজল বেলটা বাজানোর সময়ই লক্ষ করল তার হাতটা ভীষণ কাঁপছে।ওটার কর্কশ শব্দে কোনও পট পরিবর্তন হলো না।
বেশ কয়েকবার বেল চাপার পর মনে হলো ইনের ভিতরের দিকে কারও পদচারণা শোনা যাচ্ছে।শব্দগুলো তার দিকেই এগিয়ে আসছে।কাছাকাছি আসার পর ভারী পদশব্দের গতি যেন বেড়ে গেল।
হঠাৎ করেই ভারী,লাল ভেলভেটের পর্দা ফুঁড়ে এক লোক এসে তার সামনে দাঁড়াল।লোকটার মাথায় কুচকুচে কালো চুল,আর গায়ের রঙ একদম ফ্যাকাশে সাদা;সে কৌতুহলী চোখে একদৃষ্টিতে সজলের দিকে তাকিয়ে আছে।
‘জ্বি বলুন’,লোকটি জানতে চাইল,তার চোখে-মুখে জিজ্ঞাসা।
‘আমি… মানে,আজ রাতে থাকার জন্য এখানে কোনও খালি ঘর পাওয়া যাবে?’ সজল বলল।
‘আমাদের সব রুমই খালি’,লোকটি উপরের দিকে ডান হাত তুলে দেখাল।‘আবহাওয়ার এমন খারাপ অবস্থার জন্যে অন্য গেস্টরা তাদের বুকিং বাতিল করে দিয়েছেন,আজ আপনিই আমাদের একমাত্র অতিথি।কাজের চাপ না থাকায় বেশ কিছু কর্মচারীকে আমি ছুটি দিয়েছি।হয়তোবা আপনি আশানুরূপ সার্ভিস পাবেন না,তবে যতদূর সম্ভব আপনাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করব।আমরা সবসময়ই অতিথির পছন্দের দিকে খেয়াল রাখি।আজ যেহেতু আপনিই আমাদের একমাত্র অতিথি,কাজেই সবথেকে আকর্ষণীয় ঘরটিতেই আপনার থাকার ব্যবস্থা করব,রুম নাম্বার টু সিক্সটিন।‘ লোকটি কথা শেষ করে ঠোঁটের কোণায় জোর করে একটা দুর্বোধ্য হাসি ফুটিয়ে তোলায় সজলের একটু অস্বস্তি লাগল।
‘নিশ্চয়ই’,সজল বিড়বিড় করে বলল।
__


।।তিন।।


সজল তার দিকে এগিয়ে দেয়া কলম নিয়ে গেস্টবুকে সই করল;কালির রংটা অদ্ভুত,এত গাঢ়  লাল,দেখে মনে হচ্ছে ওটা রং নয়,শুকনো রক্ত!
'থ্যাঙ্ক ইউ',সজল নার্ভাস কন্ঠে কথাটি বলে কলমটা ফেরত দিল।
'আমার মনে হয় আপনি ডিনার করবেন,তাই না?'  প্রশ্ন করার সময় লোকটা মাথার ঘন চুলে আঙুল দিয়ে সিঁথি করছিল;একটা অদ্ভুত ব্যাপার,তার আইব্রাউ আর হেয়ার-লাইনের মাঝখানে দূরত্ব খুবই কম!
'ওহ! নিশ্চয়ই',সজল বলার সময় ভাবছিল,যদি তার পছন্দের খাবারগুলো এখানে পাওয়া যেত,তবে কতই না ভালো হত!
'ভেরি গুড,স্যার,ডিনার সন্ধ্যা সাতটায় ডাইনিং রুমে পরিবেশন করা হবে,ওটা আপনার হাতের বামদিকে।আসুন,আমি এখন আপনাকে রুমটা দেখিয়ে দিই।'
'নিশ্চয়ই,চলুন' সজল নির্লিপ্তভাবে বলল।
লোকটা তাকে পিছন থেকে খেদিয়ে যেভাবে সিঁড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে,নিজেকে অতিথি না ভেবে বন্দি মনে হচ্ছে।
নিচের হলওয়ের মত উপরেও রহস্যে ঘেরা অন্ধকার। একটা দরজার গায়ে লাল রঙে লেখা :  '216'
লোকটি তার হাতে একটা পুরানো আমলের নকশা করা তামার চাবি ধরিয়ে দিয়ে 'এক্সকিউজ মি' বলে দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল।
সজল তালা খুলে দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকেই মনে-মনে একটা ধাক্কা খেল। ঘরটা নিকষ কালো অন্ধকার। একটু সামলে নিয়েই পকেট হাতড়ে দিয়াশলাইয়ের বাক্স থেকে দুটো কাঠি বের করে জ্বালার পর আরেকটু ধাতস্থ হলো।
পাঁচটি মোমবাতিসহ মোমদানিটা নজরে পড়তেই ওগুলো জ্বেলে ঘরের দিকে নজর দিল।
তেমন বিশেষ কোনও আসবাবপত্র নেই ঘরে।মাঝখানে একটা পুরানো ফোর-পোস্টার খাটের উপরে চাঁদোয়া টানানো, সেখান থেকে ভারী কাপড় ঝুলিয়ে রাখা। পুরো ঘর জুড়ে এই বিছানারই রাজত্ব। কোনও দেয়ালে লাইটের সুইচ দেখা যাচ্ছে না। বিছানার পায়ের দিকে একটা টেবিলের উপর টেলিভিশন সেটটা ঘরের সমস্ত অস্বাভাবিকতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সুটকেস থেকে ব্যবহারের জিনিস বের করতে-করতে কল্পনার ঘোড়াটাকে লাগাম পরানোর চেষ্টা করল সজল। রাইট ইনের কোনও কিছুই ঠিক নেই; যেদিকেই নজর যায়। সবকিছুই কেমন অস্বাভাবিক আর অবিশ্বাস্য।
সে হাত-মুখ ধুয়ে কাপড় পাল্টে নিচে ডাইনিং রুমে নেমে এল। খিদেয় তার পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে,নইলে ঘর থেকে বেরই হত না।
ওই একই লোক-যে নিজেকে মরটিমার বলে পরিচয় দিয়েছিল সজলকে ডাইনিং রুমে অভ্যর্থনা জানাল।
মরটিমার তাকে বলল এখানে নির্দিষ্ট কোন মেনু নেই। প্রত্যেক অতিথিকে উন্নত মানের খাবার দেয়া হয়, এরকম স্থানে খাবারটা যেমন হওয়া উচিত ঠিক তেমনই।
নিজের পছন্দের হোটেলে উঠলে কী খাবার খেত, এই ভেবেই সজল অপেক্ষার সময়টা কাটিয়ে দিল।
খাবারের কোর্সে দেখা গেল একটা বিদঘুটে লাল রঙের স্যুপ। তার ভিতরে কতগুলো অস্বাভাবিক মাংসের টুকরো ভেসে আছে; ওগুলো যে কীসের তা বোঝার কোনও উপায় নেই। পেটে খিদে থাকা সত্ত্বেও সজল স্যুপ বোলটা ঠেলে দূরে সরিয়ে দিল, আশা করছে এটা দ্রুত তার সামনে থেকে যেন সরিয়ে নিয়ে যায়।
মরটিমার একটা রুপোর প্লেটে রুপোর ঢাকনা দিয়ে ঢেকে ডিনারের মেইন কোর্সটা এনে তার সামনে টেবিলে রেখে ঢাকনাটা খুলল।
সজল প্লেটের দিকে তাকিয়ে দেখে,তাতে কুণ্ডলী পাকানো শিরা সহ ধূসর কী যেন একটা রাখা আছে।
'মগজ',ঘোষণা দেবার সময় মরটিমারের মুখে সেই বিরক্তিকর হাসিটা আবারও ফুটে উঠল।
সজল মগজের থালা থেকে মুখ সরিয়ে কোনও মতে বমি ঠেকানোর চেষ্টা করল। উপরে দেয়ালের গায়ে আটকানো স্টাফ করা পশুগুলোর মাথার দিকে তাকাতেই মনে হলো ওগুলো জীবন্ত, তার দিকেই চেয়ে আছে।
মরটিমার না খাওয়া মগজ আর স্যুপ ভরা বোল দুটোই ফেরত নিয়ে গেল। সে আশ্বস্ত করল এখন যে খাবারটা আনতে যাচ্ছে,সেটা তার অবশ্যই পছন্দ হবে।
এরপর থালা ভর্তি কাটা আঙুরের উপরে পুরানো বাসি পনির কেটে সাজিয়ে আনল। এতক্ষণ ধরে খাবারের নমুনা দেখতে দেখতে সজলের আর খিদে নেই। তবুও এক টুকরো আঙুর আর পনির মুখে পুরল। সঙ্গে সঙ্গে ওয়াক থু!
একটু পরেই মরটিমার আবারও উদয় হয়ে জানতে চাইল তার জন্য ডেজার্ট নিয়ে আসবে কি না।
'আমি ঘরে ফিরে যাচ্ছি',সজল চটপট উত্তর দিয়ে এক লাফে টেবিল থেকে সরে এল। 'আমার যথেষ্ট খাওয়া হয়েছে।'
'আমাদের স্পেশাল ভিডিওটা দেখতে ভুলবেন না কিন্তু...' মরটিমার পিছন থেকে বলতে লাগল। 'ওটা ইতোমধ্যে আপনার ঘরের ভি.সি.আর -এ সেট করে দেয়া হয়েছে। আশা করি আপনার ভালো লাগবে।'
সজল উত্তর দেয়ার জন্য ঘুরে না দাঁড়িয়ে এক লাফে দুটো করে সিঁড়ি ডিঙাতে লাগল; ঘরের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকেই শক্ত করে ছিটকিনি আটকে দিল।
ঘরের মোমবাতিগুলো জ্বলতে-জ্বলতে ছোট হয়ে এসেছে। বিছানার পায়ের কাছে রাখা টেলিভিশনটার দিকে তাকাল। কী করবে বুঝতে পারছে না।
__


।।চার।।


ভিডিওটা দেখবে বলে মনস্থির করল সজল।
দাঁত মেজে, শোয়ার জন্য পোশাক পাল্টে পাজামা পরে, বিছানায় উঠে বসল। টেলিভিশনটা অন করে ভি.সি.আর এর প্লে বাটনে চাপ দিল। 
স্ক্রিনে পরিষ্কার ছবি আসার আগে বেশ কয়েক মিনিট ঝাপসা দেখাচ্ছিল।
সজল নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসল। চোখে ভুল দেখছে না তো? টি.ভি - তে তো ওকেই দেখাচ্ছে!
স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে সে কীভাবে আজ রাতে ইনে এসে ঢুকল; ছবিতে মোমবাতির কাঁপা-কাঁপা আলো পড়ে ওর চেহারাটাকে ভৌতিক করে তুলেছে।
এখানে কী হচ্ছে এসব? ওহ, ঈশ্বর!
সজল ক্রিনে দেখতে পাচ্ছে; সে লবির চারদিকে তাকাচ্ছে, বেল বাজাল, কারও আসার জন্য অপেক্ষা করছে।
ভেলভেটের পর্দার ফাঁক দিয়ে মরটিমার এসে প্রবেশ করার পর ভিডিওতে নতুন দৃশ্যের অবতারণা হলো। ক্যামেরাটা ওর পিঠের পিছনে ঘুরছে; সজল ডাইনিং রুমটা চিনতে পারল।
দেখতে-দেখতে হঠাৎ করে তার চোয়াল ঝুলে পড়ল, গলা শুকিয়ে কাঠ, হৃদপিন্ডটা মনে হচ্ছে বুকের খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে আসবে।
মরটিমার যখন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল, প্রথম দেখে ঘরটাকে ভূগর্ভস্থ ভান্ডার বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে ঘরটার আসল রুপ স্পষ্ট হয়ে উঠল; ওটা একটা বন্ধ, অন্ধকার কারাগার। বন্দিকে অত্যাচার করার সব ধরনের সরঞ্জাম এখানে মজুদ আছে; দেয়াল থেকে ভারী, মোটা-মোটা লোহার শিকল ঝুলছে....
ওই রহস্য-মানব, যার মুখটা ক্যামেরার পিছনে লুকিয়ে আছে, সে ধীরে ধীরে পাতালঘর থেকে বেরিয়ে নীচতলার লাইব্রেরিতে এসে ঢুকল। ওই ঘরের সবকয়টা জানালায় ক্যামেরাটা ঘোরানোর সময় দেখা গেল কাঁচের বাইরে থেকে অনেকগুলো ভুতুড়ে চেহারা ভয়ঙ্কর ক্রোধ নিয়ে ভিতরের দিকে দেখছে, ঘরে ঢুকতে চাইছে।
সজল বিছানার কভারটা শরীরের উপর টেনে নিল। তার হাত-পা ঠান্ডা বরফ হয়ে গেছে।
তার দৃষ্টি স্ক্রিনে আটকে আছে; দেখতে পাচ্ছে লোকটা লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে আসছে।
হঠাৎ ওর ভয় লাগতে শুরু করল; ভয়ের কারণটাও বুঝতে পারছে। অদৃশ্য চেহারার প্রতিটা পদক্ষেপ তার ভিতরে ভীতির সঞ্চার করছে।
লোকটা হলওয়ে পেরিয়ে ষোল নম্বর রুমের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ; দরজায় নক করছে।
প্রতিধ্বনির মত, সজলের দরজায় সত্যিকারের কড়া নাড়ার শব্দ শোনা গেল।
সজল শ্বাস নিতে পারছে না, দমবদ্ধ হয়ে আসছে। সে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে; ঝট করে আবার ক্রিনের দিকে চাইল।
ক্যামেরার লেন্সটা হঠাৎ করেই ঘুরে গিয়ে লোকটার মুখের উপর ফোকাস করল; সে ষোল নম্বর রুমের দরজার সামনে দাঁড়ানো।
ওহ! গড! ওটা... ওটা একটা ভ্যাম্পায়ার। তার ধারালো,হিংস্র দাঁতগুলো বাইরে বেরিয়ে আছে, জ্বলজ্বলে রক্তলাল চোখদুটো সোজা সজলের দিকেই তাকিয়ে আছে!
একটা দীর্ঘ,রক্ত হিম করা তীক্ষ্ণ চিৎকার দিয়ে সজল থরথর করে কাঁপতে লাগল।
দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ বেড়েই চলেছে। মনে হচ্ছে কেউ দরজায় ধাক্কা দিয়ে ভেঙেই ফেলবে।তখনই তালায় চাবি ঘোরানোর ঝনঝন শব্দ শোনা গেল।
শেষবারের মত ক্রিনে ভ্যাম্পায়ারটার মুখের দিকে তাকিয়ে সজলের দাঁতকপাটি লেগে গেল।
মরটিমার দরজা খুলেই দৌড়ে তার কাছে এল।মোমদানিটা এনে সজলের মুখের কাছে ধরতেই দেখল তার মুখ ভয়ে, আতঙ্কে সাদা হয়ে গেছে, জ্ঞান নেই। সে তখন গর্বভরা দৃষ্টি নিয়ে টেলিভিশনের দিকে তাকাল; এই ঘটনার সমস্ত ক্রেডিট ওটার ক্রিনে ভেসে আছে।
..'আ ফিচার প্রেজেন্টেশন অব ফ্রাইট ইন দ্য ফ্যান্টাসি থিম হোটেল ফর হরর লাভারস'...
মরটিমার ঝুঁকে সজলের নাড়ির গতি পরীক্ষা করেই, নীচতলায় লবিতে কাছের হাসপাতালে কল করার জন্য ছুটল।
সেখানে ডাক্তারকে বলল তাদের একজন অতিথি 'ফ্রাইট ইন'- এর ভিডিওটি দেখার সময় অজ্ঞান হয়ে গেছে।
ডাক্তার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রোগীকে তাদের ইমারজেন্সী রুমে নিয়ে যেতে নির্দেশ দিলেন।
মরটিমার যখন সজলকে তুলে এনে হোটেল ভ্যানের ব্যাকসিটে রাখল; সে একটুও নড়াচড়া করেনি, মড়ার মত অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইল। খুব সাবধানে গাড়ি ড্রাইভ করে মরটিমার মেইন রোডে এসে উঠল। যখন হোটেলের সাইনটা পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল, তখন দেখল প্রথম বর্ণের নিয়ন বাতিটা বন্ধ হয়ে আছে।
অদ্ভুত, সে নিজের মনে ভাবল। 
দূর থেকে ওটাকে মনে হবে : 'FRIGHT INN' নয় -- 'RIGHT INN' !!


Fund For Healthcare Around The World 




Post a Comment

Previous Post Next Post