এক জোড়া ক্লান্ত পা 

রুদ্র মেহেরাব


এক জোড়া ক্লান্ত পাঃ রুদ্র মেহেরাব (ছোটগল্প)


শুভ্র দ্রুত পা চালিয়ে হাটছে। কত কিলো হবে হেঁটেছে? ঢাকা মেডিকেল থেকে  বাড্ডা। দূরত্ব মোটেও কম নয়। তিন চার কিলো তো হবেই। অনেক রাত হয়ে গিয়েছে। পথ ও যেন ফুরোচ্ছে না আর। দাঁড়িয়ে দম নিলো শুভ্র। পা ভারি হয়ে আসছে ওর৷ চলতে সায় দিচ্ছে না আর। তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যাবার মতো দশা। সাথে একবোতল পানি থাকলে ভালো হতো। পকেটে একটি টাকাও নেই৷ শ'খানেক যা ই ছিলো নীরাকে ওষুধ কিনে দিয়ে এসেছে। আচ্ছা নীরা এখন কি করছে? ঘুমিয়েছে? নাকি এখনো ব্যাথায় ছটফট করছে? ফোন দিবে? না থাক। যদি ঘুমোয় তাহলে ঘুমটা নষ্ট হবে। আসার সময় শুভ্র অবশ্য ব্যাথার ওষুধ আর তার সাথে একটা ঘুমের বড়ি খাইয়ে এসেছে। মেয়েটার স্বভাব একদম বাচ্চাদের মতো। ওষুধ পথ্য একদম খেতে পারে না৷ ওষুধ দেখলেই শিশুসুলভ ওয়াক - ওয়াক করতে থাকে। বড্ড মায়া হয় শুভ্রর। নীরার শুকনো মুখের দিকে তাকাতে পারে না। ভেতরটা হু হু করে উঠে। বুক ফেটে কান্নার রোল দমকে উঠে। কাঁদতে পারে না নীরার সামনে৷ পাছে নীরা ও যদি কেঁদে উঠে ভেউ ভেউ করে! তাছাড়া বউয়ের সামনে কি আর স্বামীদের কাঁদা শোভা পায়? নীরার সামনে শুভ্র নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে৷ কিন্তু আড়ালে আবডালে  ঠিকই কাঁদে! বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে।  


 শুভ্র মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকায়। বিষন্ন শ্রাবণের অমিয় ধারা মতো তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে উষ্ণ নোনা জল। আকাশ জুড়ে অগনিত তারা। অভিযোগহীন জ্বলে চলেছে আজন্ম। তারাদের ওপারেই নাকি সৃষ্টিকর্তার বাস। সেখানে বসেই তিনি লীলাখেলা করছেন। শুভ্র করুণ আর্তি মাখা চোখে তারাদের ওপারে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। কেউ কি আছে ওপারে শুভ্রর এ আর্তচিৎকার শোনার জন্য?

 - হে  আল্লাহপাক! হে পরোয়ারদেগার! তুমি আমার নীরাকে সুস্থ করে দাও। আমার নীরাকে তুমি আমার কাছে ফিরিয়ে দাও।

শুভ্র অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রার্থনার মতো করজোড় করে আকাশের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলো। তার দৃষ্টি অসীমের সীমা ছাড়িয়ে বহুদূর। 



বেশিদিন হয়নি শুভ্র আর নীরা বিয়ে করেছে। চার কি পাঁচ মাস হবে। পালিয়ে বিয়ে করেছে ওরা। শুভ্রর ত্রি-ভূবনে কেউ নেই বউটা ছাড়া। ছোটবেলায় বাবা মা কে হারিয়েছে। মায়ের চেহারা একটু আধটু মনে পড়লেও বাবার চেহারা একদমই মনে নেই। যক্ষা হয়েছিলো বাবার। কি ডাক্তার কি কবিরাজ কোনকিছুতেই  শেষ রক্ষা হলো না। মা মারা গেলেন তিন দিনের জ্বরে। ডাক্তার দেখানোর মতো টাকা ছিলো না সেসময়। চারদিনের দিন খবর পেয়ে ছোট মামা এলেন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। কিন্তু ডাক্তারের কাছে আর যাওয়া হলো না মায়ের৷ পথিমধ্যেই মা খুঁজে নিলেন জীবনের শেষ পথটুকো।


পড়ুন >>> বেলীফুল রোমন্থন


 শুভ্র মানুষ হয়েছে চাচার কাছে। পড়াশোনাও চাচার বাসায় থেকে। চাচী ছিলেন প্রচন্ড বদমেজাজী।  কতদিন যে অনাহার অর্ধাহারে কাটিয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। শেষতক একটা চাকুরি পেয়ে রক্ষা পেলো কিছুটা। তাও কি বাঁচার উপায় আছে? থাকার জায়গা নেই, যাবার জায়গা নেই, নেই কোন আপনজনও। সাথে উঠতে বসতে চাচীর খোঁটা তো আছেই। 


 সেই দূর্বিষহ জীবনে একদা শুভ্রর পরিচয় হয় নীরা নামের মেয়েটির সাথে। মায়াবতী মেয়ে নীরা। এমন মায়া যেনো পাষানেরও মন গলিয়ে দিবে! প্রেমে পড়ে গেলো শুভ্র। প্রেমে পড়লো নীরাও। অতঃপর পালিয়ে বিয়ে। নীরার বাবা মা কোনভাবেই মেনে নেয় নি তাদের এ প্রণয়। তাতে কি? ভালোবাসাকে কি আঁটকে রাখা যায়? বাবা মা কে ছেড়ে শুভ্রর কাছে চলে আসে নীরা। ঘর বাঁধে শুভ্রর সাথে। ছোট্ট ছিমছাম গোছানো সংসার তাদের। অল্প সময়ের মধ্যেও নীরা বেশ সামলিয়ে নিয়েছে। দেখলে কে বলবে মেয়েটা বাপের বাড়িতে গ্লাসে পানি টুকুন পর্যন্ত ঢেলে খেতো না?  


অনুগল্পঃঅপেক্ষা


নীরা ওভারিতে টিউমার নিয়ে ভর্তি হয়ে আছে ঢাকা মেডিকেলে। ডাক্তার বলছেন বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে। টিউমার এখন ক্যান্সার হয়ে সারা শরীরে বিষের বীজ বুনে দিচ্ছে। ইশ! না জানি নীরার কত্তো কষ্ট হচ্ছে! ডাক্তার বলে দিয়েছেন বাঁচার কোন আশা নেই। তবুও শুভ্র বুক বাঁধে। যা কিছু লাগে করে দেখবে, মনে মনে ভাবে ও। তার অন্তর আত্মা তাকে আশাজাগানিয়া গান শোনায়। বীজ বোনায় স্বপ্নের। এমন মায়াবী মুখটার জান কবজ করতে আজরাইলের হাত কাঁপবে না? শুভ্র স্বান্তনা খোঁজার চেষ্টা করে।


রাত এখন ক'টা হবে? ভোরের আলো ফুটতে আর কতো দেরি? না, দ্রুত যেতে হবে বাসায়। সকালের মধ্যে টাকা জোগাড় করেতে হবে৷ কালকে অপারেশন হবে নীরার। শুভ্র আরো দ্রুত পা চালাতে লাগলো। হঠাৎ লক্ষ্য করলো সে পড়ে আছে ফিরোজা রঙের বিয়ের পাঞ্জাবিটা। নিউমার্কেট থেকে কিনেছিলো বিয়ের আগেরদিন। নীরার পছন্দে কিনেছিলো। প্রথমে লাল পাঞ্জাবি কিনবে বলে শুভ্র মৃদু প্রতিবাদ করলেও শেষে নীরার পছন্দটাই সই। নীরা বলতো পাঞ্জাবিটা পড়লে তোমাকে দেখাবে বাউলের মতো৷ আর আমি হবো বাউল বউ৷ নীলকণ্ঠ মনি পাখির মতো আমরা উড়ে বেড়াবো দেশদেশান্তরে। বাঁধনছেঁড়া গান গেয়ে যাবো একে অন্যের বুকে মাথা গুঁজে। ভালো হবে না বলো? শুভ্রর চোখের তারা ঝলমল করে উঠতো শুনে। নিজেকে গেরুয়া বাউল ভাবতে ভাবতে নীরকে নিয়ে সে কতোদিন কল্পলোকে হারিয়ে গেছে! কিন্তু কি আশ্চর্য! সকাল থেকে সেই পাঞ্জাবিটাই পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে শুভ্র অথচ একবারো নিজের নজরে পড়লো না!  


Fund For Healthcare Around The World 


মাথার উপর একাদশীর চাঁদ। চাঁদের আলোয় ভাসছে গোটা শহর। কালো পিচের মূর্তিমান রাজপথ আর একঘেয়ে শহুরে অলিগলিও বাদ যায়নি সে প্লাবন  থেকে। জোছনা আর সোডিয়াম আলো মিলেমিশে হয়েছে এক অপার্থিব পরিবেশ৷ যেনো এ শহরটা বহুকাল আগের পুরনো এক গোলকধাঁধা। নিশাচর প্রাণীদের মতো শুভ্র হেঁটেই চলছে। এই পৃথিবীতে তার কেউ নেই। তার অতি প্রিয়জন হাসপাতেলের বিছানায় কাতরাচ্ছে। ক্লান্তিতে শুভ্রর সারা শরীর নুয়ে আসছে। তবুও নিয়নে সিক্ত কালো পিচের বুক পিষে এগিয়ে চলছে একজোড়া ক্লান্ত পা, বিশ্বস্ত যন্ত্রের মতো।  



©রু দ্র

Post a Comment

Previous Post Next Post