ময়নাতদন্তের ইতিবৃত্ত
(দ্বিতীয় এবং শেষ পর্ব)
রশিদ সাহেবের প্রচন্ড মেজাজ খারাপ। সকাল থেকে উনি রাগারাগি করে যাচ্ছেন। রাগারাগি করে ইতোমধ্যে দুই দুইটা চায়ের কাপ ভেঙেছেন। এই মুহুর্তে তার আরেকটা ভাঙতে ইচ্ছে করছে। তিনি বেল টিপলেন। ডিপার্টমেন্টের কেরানী বদি মিয়া ভয়ে ভয়ে রুমে ঢুকলো।
- স্যার কিছু লাগবো?
- বদি আরেকটা চায়ের কাপ নিয়ে আয়।
- খালি কাপ নাকি লগে চা ও দিমু?
- খালি কাপ আন।
- খালি কাপ দিয়ে কি করবেন স্যার? ভাঙবেন?
- বেশি কথা বলিস কেনো? যেটা করতে বলেছি সেটা কর।
![]() |
| খন্ডগল্পঃ ময়নাতদন্তের ইতিবৃত্ত (প্রথম পর্ব) |
বদি বিপদ বুঝতে পারে। সকালে তার সামনেই দুইটা চায়ের কাপ ভেঙেছে রশিদ সাহেব। প্রথমটা ভেঙেছে চায়ে চিনি কম হয়েছে সেজন্য৷ আর দ্বিতীয়টা কাপের গায়ে ময়লা লেগেছিলো বলে। স্যারের আইজক্যা মাথা খারাপ হইয়া গেছে। আইজক্যা কপালে শনি আছে আমার। বদি টি স্টোরের পুরনো কাঠের আলমারিটায় কাপ খুজতে লাগলো। কাপ পাওয়া গেলো না। স্যারকে কি বলবে এখন? বদির কপালে সত্যিই শনি আছে আজকে। শালার কেরানীর চাকরিটাতেই সমস্যা৷ সব ঝড় এই অধম কেরানীর উপর দিয়া যায়। ক্যান এই চাকরিরতে আইল্যাম? হের চেয়ে ভালা আছিলো ভিক্ষা কইরা খাইলে। মনেমনে নিজের উপর ক্ষোভ ঝাড়ে বদি।
- স্যার কাপ নাই। আলমারি তন্নতন্ন কইর্যা খুইজ্যাও কাপ পাই নাই।
- কাপ নাই মানে? তোর আগের স্যার কি ডিপার্টমেন্টের চায়ের কাপও বিক্রি করে দিয়েছে নাকি?
- না স্যার৷ হেয় বহুত ভালা মানুষ আছিলো। মাটির লাহান ভালা মানুষ।
- বদি আমি কি খারাপ মানুষ?
বদি থতমত খায়।
-না স্যার। আপনেও ভালা মানুষ। স্য্যার একটা কাচের পিরিচ আছে। হেইডা আইন্যা দেই? ভাইঙা আরাম পাইবেন৷ বড় জিনিস। জোড়ে শব্দ হইবো।
- আমার সাথে মশকরা করিস! আমি কি তোর দুলাভাই? আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ!
এস আই সুধীর বাবুর সাথে রশিদ সাহেবের খুব মাই ডিয়ার টাইপ সম্পর্ক। দু'বছর আগে সুধীর বাবু যখন খাগড়াছড়ি থেকে ট্রান্সফার হয়ে ধানমন্ডিতে এলেন তখন থেকেই পরিচয়।
- রশিদ সাহেব কখনো খাগড়াছড়ি থেকে কোন পুলিশকে ধানমন্ডিতে ট্রান্সফার হতে দেখেছেন? একহাজার টাকার বাজি। দেখেন নাই। ডিআইজিকে কত টাকা খাওয়াইছি জানেন? নগদ ত্রিশ লাখ টাকা।দুইবছরের মধ্যে এর ডাবল ইনকাম করতে হবে। Now this is my aim in life.
সুধীর বাবু আর রশিদ সাহেবের টাকা কামানোর পথ একই। যেনো চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। সুধীর বাবু রশিদ সাহেবকে দিয়ে সত্যিকে মিথ্যা বানায় আর মিথ্যাকে সত্যি৷ মার্ডার কেইসকে অটোপসি রিপোর্টে সুইসাইড কেইস আর সুইসাইড কেইস কে মার্ডার কেইস বানানোই রশিদ সাহেবের কাজ।কোর্টে সেই মোতাবেক সাক্ষী দিয়ে দুজনই টাকার পাহাড় বানিয়ে চলেছেন৷
রশিদ সাহেব ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তার। যত মার্ডার, রেইপ কেইস, অপমৃত্যু সবকিছুর অটোপসি রিপোর্ট তার হাত দিয়েই হয়। তিনি যদি কোন হেরফের করে দেন তাহলে সেটাই সই! কোর্টে সেই মোতাবেক কিছু ভূয়া স্বাক্ষী আর আলামতের বর্ননা দিতে পারলেই মামলা জিতে গেলো। মিথ্যা অটোপসি রিপোর্ট বানিয়ে আসামীকে জিতিয়ে দিতে পারলেই মোটা টাকা ইনকাম। সুধীর বাবু আর তিনি একাজটাই করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। সুধীর বাবু আজকে সকাল সকাল চলে এসেছেন। কাহিনী কি? নতুন কোন কেইস আছে নাকি? রশিদ সাহেবের মন উৎফুল্ল হয়ে উঠতে লাগলো। মেজাজ খারাপ ব্যাপারটা এমূহুর্তে আর হচ্ছে না। লাশের সাথে প্রতারণা করেই তো তার জীবন চলে। তিনি মনে মনে বললেন - হে লাশ। আমাকে ক্ষমা করে দিও।
ধানমণ্ডি থানার এস আই সুধীর বাবু বসে আছেন রশিদ সাহেবের সামনে। টেবিলে চা রাখা আছে তার জন্য৷ চা খাওয়ার ব্যাপারে তার বিশেষ আগ্রহ আছে বলে মনে হচ্ছেনা। তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা ভাবছেন। চায়ের কাপ ঘিরে দুটি মাছি ঘুরঘুর করছে। দেখতে অদ্ভুত রকমের বড়৷ এ মাছিগুলো কেবল গ্রীষ্মকালেই দেখা যায়৷ কাঠালের গন্ধ পেলেই এরা ঘরের ভেতরে ঘুরঘুর করতে থাকে। আশ্চর্য। এই মাছি এখানে কি করে? এটাতো কাঠালের বাজার নয়৷ এটা ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট। শতবছরের পুরনো একটা দোতলা ইটের বিল্ডিংয়। নিচে মর্গ। উপরে অফিস আর ক্লাসরুম। বিল্ডিংটা মূল একাডেমির ভবন থেকে একটু দূরে হওয়ায় সহজে কেউ এদিকটায় আসেনা। পিছনে ছোটখাটো জংলার মতো ঝোপঝাড়। সেখানে কিছু পরিত্যক্ত গাড়ি পড়ে আছে বহুবছর ধরে। ছাত্রছাত্রীরা বিপদে না পড়লে এপথ দিয়ে যায় না। ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট নিয়ে তাদের মুখে ভৌতিক গল্পের শেষ নেই।
রশিদ সাহেবের রুমে দুটো সিলিং ফ্যান। একটি নষ্ট। আরেকটি মাথার উপর ঘটঘট করে ঘুরছে। রুমে এসি লাগানো আছে৷ কিন্তু এসির ব্যাপারটা তাজ্জব। এসি শুধু শীতকালে কাজ করে৷ গরমেরদিনে কাজ করেনা। হাজার ইলেকট্রিশিয়ান দেখিয়েও কাজ হয়নি৷ নতুন এসির জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে তিন বছর আগে৷ এখনো কোন সাড়াশব্দ নেই।
- রশিদ সাহেব, কেইসটা ঘুরিয়ে দিতে পারলে কিন্তু একটা হেলথি এমাউন্ট কামাই করে নেয়া যাবে। মালদার পার্টি। কাউন্সিলরের ছেলে। টাকা পয়সা ওদের কাছে কোন বিষয়ই না।
- সবই বুঝলাম৷ কিন্তু কাউন্সিলরের ছেলে কাজের মেয়েকে রেইপ করে খুন করেছে। বিষয়টা মিডিয়ায় চলে এসেছে৷ সামলানো যাবে তো?
- দল যখন ক্ষমতায় আছে ওরা ঠিকই সামলায় নিতে পারবে। আপনার কাজ রেইপ কেইসটাকে সুইসাইড কেইস বানিয়ে দেয়া৷ রিপোর্টে লিখে দিন ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি৷ মামলা ডিশমিস।
- তদন্ত রিপোর্ট?
- ওটা নিয়ে ভাববেন না৷ আমি হলাম মিথ্যার রাজা৷ মিথ্যা কথা বলে ইবলিশকে ও তেতুলের ঘোল খাওয়ায় দিতে পারবো৷ হা হা হা৷
- লিখবেন কি?
- এই ধরুন মেয়েটা বাসার কাজের ছেলের সাথে ভাব-ভালোবাসা করতো। ছেলেটা দৈহিক সম্পর্ক করে এখন মেয়েটাকে ছেড়ে দিয়েছে। এদিকে মেয়েটা প্রেগন্যান্ট। সেইজন্য লজ্জায় গলায় ফাসি দিয়েছে৷ তার গরীব বাবা মা অর্থের লোভে কাউন্সেলরের ছেলেকে ফাসাতে চাইছে। হয়ে গেলো..!
- খুব একটা স্ট্রং মনে হচ্ছে না আমার।
- আচ্ছা সেটা পরে দেখা যাবে। ময়নাতদন্তের কাজ শুরু করেন৷ লাশ নিচ তলায় রাখা আছে৷ মিডিয়ার কিছু লোকজন আসছে৷ এরা হলো মাছির মতো। ভূলেও মিডিয়ার সামনে কিছু বলবেন না৷
- ঠিক আছে৷ ইনকোয়েস্ট আর চালান দিন৷
রশিদ সাহেব আর সুধীর বাবু অফিসিয়াল ফর্মালিটিস সেরে নিচ তলায় নেমে এলেন। ইতোমধ্যে কাউন্সিলর নিজে রশিদ সাহেবকে ফোন দিয়েছেন৷ যতটাকাই লাগুক এটাকে আত্মহত্যা বানায় দিতে হবে। কাজটা করে দিলে বড় একটা সম্মানী দেবার কথা জানালেন৷
অটোপসি রুমটা খুব একটা বড় নয়৷ রুমের ভেতর আশটে গন্ধ৷ পুরনো বিল্ডিং বলে অনেক জায়গায় দেয়ালের প্লাস্টার উঠে গিয়েছে। সিলিংয়ের অবস্থাও ভালো না। দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুনি ধপাস করে মাথার উপর পড়বে। রুমে বাতি জ্বলছে৷ তবুও মনে হচ্ছে এ আলো পর্যাপ্ত আলো না। আলোছায়ার মাঝামাঝি একটা পরিবেশ। রশিদ সাহেব অটোপসি রুমে ঢুকলেন। লাশটা একপাশে রাখা। সাদা কাপড়ে ঢাকা৷
লাশটাকে অটোপসি টেবিলে তোলা হলো৷ সাদা কাপড়টা সরাতেই একটা মলিন মুখ দেখতে পেলেন তিনি৷ কত হবে বয়স? চৌদ্দ কি পনের? জ্যান্ত মানুষের মতো তাকিয়ে আছে। যেন চোখ ভরা বিস্ময় আর ঘৃণা। ঠোঁটে কামড়ের দাগ। কেটে গিয়েছে কয়েক জায়গায়। কাটা ঠোঁট দিয়ে কি এখনো রক্ত পড়ছে? গলায়, বুকে,স্তনে,নাভীতে আচড়ের দাগ। দেখে মনে হচ্ছে কোন হিংস্র জন্তু কামড়িয়েছে। ভ্যাজাইনায় জমাট বেধে আছে কালচে রক্ত।
ডোম নিথর দেহটাতে ছুড়ি চালাতেই রশিদ সাহেবের ভেতরটা কেপে উঠলো। তিনি কাপা কাপা হাতে অটোপসি রিপোর্টে ফাইন্ডিংসগুলো লিখে যেতে লাগলেন৷ হাত কাপছে কেনো তার আজকে? এর আগে তো কখনো এমন হয়নি। এই হাত দিয়েই তো কত মানুষের মিথ্যা রিপোর্ট লিখেছেন! কত মৃতকে তার শেষ ন্যায্য থেকে বঞ্চিত করেছেন! তার কলমের খোচায় বেচে গিয়েছে কত মানুষরূপী হায়েনা! তাহলে আজকে এমন হচ্ছে কেনো? তবে কি রশিদ সাহেবের বিবেক জেগে উঠেছে? না৷ এটা হতে পারেনা৷ খারাপ মানুষের বিবেক থাকেনা৷ রশিদ সাহেব খারাপ মানুষ। হঠাৎ মেয়েটার মুখের দিক তাকাতেই তার নিজের মেয়ের মুখটা ভেসে উঠলো লাশের চেহারায়। তার মনে হতে লাগলো লাশ হয়ে শুয়ে থাকা মেয়েটা তার মেয়ে মারিয়া। একটা জানোয়ার তার মেয়েকে ক্ষতবিক্ষত করে রেখেছে। তিনি পুরনো চারদেয়ালের বদ্ধ একটা রুমে নিজের মেয়ের অটোপসি রিপোর্ট লিখে যাচ্ছেন। রশিদ সাহেবের হাত আর চললো না। তিনি বেহুশ হয়ে পড়ে গেলেন।
©রুদ্র

Post a Comment