![]() |
| রুদ্র মেহেরাবের ছোটগল্পঃ দগ্ধ |
দগ্ধ
নুহাকে আমি একদিনই পড়িয়েছি। দ্বিতীয় দিন যাবার আর দরকার পড়ে নি। আমাকে দেখে মেয়েটা খুব ভয় পেয়েছিলো সেদিন। এরকম কিছু মোটেও আশা করেনি নিশ্চয়ই। ওর মা'র চেহারাও ছিলো দেখার মতো। দরজা খুলে আমাকে দেখে ভদ্র মহিলা ভীষন রকমের ঘাবড়ে গেলেন। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে আমাকে ভেতরে এসে বসতে বললেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে পড়ানোর সময় ভয়ে নুহার হাত থেকে বারবার কলম পড়ে যাচ্ছিলো। মেয়েটা এতোটাই ভয় পেয়েছিলো যে আমার সামনে সারাটাক্ষন মাথা নিচু করে বসে ছিলো। আমার দিকে ভূলেও একবারের জায়গায় দুইবার তাকায় নি। অল্প কিছুক্ষণ পড়িয়ে বাসায় চলে এসেছিলাম সেদিন। বাসায় আসতেই নুহার মায়ের ফোন,
- বাবা, কিছু মনে করো না। আমার মেয়েটা তোমাকে দেখে প্রচন্ড ভয় পেয়েছে। ভয়ে ও এখনো কাঁপছে। এরকম ভয় নিয়ে কি ও রোজ পড়তে পারবে,বলো?
- সমস্যা নেই আন্টি। আমি বুঝতে পেরেছি। আপনারা অন্যকোন টিউটর নিয়ে নিন।
ফোন রেখে দিয়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালাম। ব্যস্ত মানুষগুলো পিপীলিকার মতো ছুটে যাচ্ছে নিজ নিজ গন্তব্যে। চোখেমুখে ক্লান্তি আর ঘরে ফেরার তাড়া। শুধু আমিই বোধহয় স্রোতহীন নদীর মতো আপোষহীন পড়ে আছি। নিজেকে আজকাল স্টেশনে পড়ে থাকা জরাজীর্ণ মালগাড়ীটার মতো মনে হয়। কোন গন্তব্য নেই। নেই কোন ছুটে চলার তাগিদ।
আসলে টিউশনিটা আমার খুব দরকার ছিলো। থাকা খাওয়ার চিন্তাটা অন্তত দূর হতো মাথা থেকে। কিন্তু যেখানেই পড়াতে গিয়েছি চেহারা দেখে ভয় পেয়ে কেউ টিউটর রাখতে রাজী হয়নি। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট লাগতো৷ বুক ভেঙে কান্নার রোল দমকে উঠতো। এখন আর লাগে না৷ এটাকে বোধ হয় অভ্যস্ততা বলে। কারো কাছে যে একদণ্ড সাহায্য চাইবো সে সুযোগও নেই। এ শহরে আমার আপনজন বলতে নেই কেউ। শুধু এ শহর কেনো তামাম দুনিয়ায় কি আমার কেউ আছে? নেই। কেউ নেই। আমার আপন হচ্ছি কেবল আমি আর আমার ছায়া।
ছোটবেলা থেকেই সবাই আমাকে খুব ভয় পেতো। আমার দিকে একবার তাকিয়েই ভয়ে চিৎকার দিয়ে দৌড়ে পালাতে দেখেছি গ্রামের ছোট ছেলে-মেয়েদের। আমার মনে আছে, যখন প্রাইমারী স্কুলে পড়তাম, আমাকে বসতে হতো একদম পিছনের বেঞ্চে। আমার সামনে দুই তিন বেঞ্চ ফাঁকা পড়ে থাকতো। কেউ বসতো না ভয়ে। স্যার ম্যাডামরাও কোনদিন স্নেহমাখা স্পর্শে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করেননি। কখনো পড়াও ধরেনি। হাত তুললেও না। ক্লাসের এককোনায় একঘরে হয়ে পড়ে থাকতাম সবসময়। আমার ক্লাসে থাকা না থাকার যেনো কোন গুরুত্ব নেই। কেউ কথা বলতে আসতো না আমার সাথে। এমনকি আমাকে খেলতে নেয়াও ছিলো বারন। টিফিন টাইমে সবাই যখন মাঠে ছুটোছুটি করত, হরেক রকম খেলা খেলতো,আমি তখন বারান্দার খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ওদের মজা করা দেখতাম। নিজেকে তখন বিষাক্ত সংক্রামন মনে হতো যেনো আমার সাথে মেলামেশা করা ভয়ানক এক অমোচনীয় পাপ।
মা খুব শখ করে আমার নাম রেখেছিলেন শুভ্র। দেখতে ধবধবে সাদা হয়েছিলাম বলে হয়তো এই নাম। আমাকে পেয়ে মা যে কি খুশি হয়েছিলেন! সারাদিনই নাকি আমাকে কোলে নিয়ে বসে থাকতেন৷ অন্য কোন কাজ করতেন না। কিন্তু সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। পাঁচ কি ছয় মাস বয়স তখন আমার। হঠাৎ একদিন মায়ের প্রচন্ড পেট ব্যাথা শুরু হলো। সাথে রক্ত বমি। মা সইতে পারলেন না সেই ব্যাথা। আমাকে সারা জীবনের জন্য একা করে চলে গেলেন চিরনিদ্রার দেশে। মাঝে মাঝে খুব অভিমান হয় মায়ের উপর। যে মা দশ মাস দশদিনের অসহ্য ব্যাথা সহ্য করে আমাকে দুনিয়ার মুখ দেখাতে পারলেন,সেই মা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আর ক'টাদিন থেকে থেকে যেতে পারলেন না কেনো?
মায়ের মৃত্যুর কয়েক বছর পর বাবা আরেকটা বিয়ে করলেন। ঘরে নতুন মা আসলো ৷ আমি তখন কেবল বুঝতে শিখেছি। নতুন মাকে পেয়ে আমার আনন্দ যেনো আর ধরে না ! আমি ভাবতাম বাবা মনে হয় আমাকে আদর যত্ন করবার জন্য নতুন মা নিয়ে এসেছে। সৎমা আর আসল মা কি জিনিস তখনো বুঝার বয়স হয়নি৷ আমার কাছে তখনো মা মানেই আমার আগের মা৷ ভাবতাম মা আমকে কোলে নিয়ে আদর করবে, 'আয় আয় চাঁদ মামা ' ছড়া শুনিয়ে ভাত খাওয়াবে, গল্প শুনাবে, চিপস জ্যুস কিনে দিবে! যখনই মা আমাকে ডাকতো, একটু আদর পাবার লোভে আমি ছুটে চলে যেতাম তার কাছে। মনে মনে ভাবতাম, এই বুঝি আমাকে কোলে নিবে, সোনা মানিক বলে জড়িয়ে ধরে গালে চুমো খাবে। কিন্তু কিছুদিন পরই আমার ভূল ভেঙ্গে গেলো। বাবার সাথে মা কি নিয়ে যেনো প্রচন্ড ঝগড়া করলেন। খুব সম্ভবত আমাকে নিয়েই। বাবা রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন। আমি সারাদিন বাবার অপেক্ষায় বসে রইলাম। সকাল গেলো, দুপুর গেলো, বিকেলও যায় যায় - বাবা আর আসেনা। এতো নিষ্ঠুর কেনো আমার বাবা? আমার কথা কি তার একবারও মনে পড়ে না?
সেদিন রাতে মা আমাকে পিছনের ভাঙ্গা ঘরটায় নিয়ে গেলেন। দিনভর কেদে কেদে ক্লান্ত আমি। সারাদিন পেটে দানা পানি পড়েনি কিছু। ক্লান্তি আর ক্ষুধায় চোখ বন্ধ হয়ে আসছিলো। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই আমার সৎমা আমার মুখে পানির মতো কিছু একটা ঢেলে দিলেন। বড় হয়ে জেনেছি এটাকে এসিড বলে।আমার সারা মুখ জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো মুখটা কেউ জ্বলন্ত চুল্লিতে চেপে ধরে রেখেছে আর মুখের চামড়াগুলো খসে খসে পড়ছে আগুনের হলকায়। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসতে লাগলো। আধ হাত দূরে থাকা মায়ের মুখটাও ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। কোনমতে মা.. গো.. বলে একটা চিৎকার দিয়েই বেহুশ হয়ে গেলাম৷
এখনো আয়নার সামনে দাড়ালে নিজেকে খুব অপরিচিত মনে হয়। ভয়ে আতকে উঠে আমার অন্তর আত্মা। এটা কি সত্যি আমি? অনেক অভিমানী মনটা নিজের অজান্তেই বলে উঠে - মা, তোমার ওখানে কি একটু ঠাঁই হবে?
©রু দ্র

Post a Comment